× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এমপিআই প্রতিবেদন

দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা ও সমাজের দায়বদ্ধতা

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫০ এএম

দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা ও সমাজের দায়বদ্ধতা

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ন্যাশনাল মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স (এমপিআই) ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। প্রায় ২৪ শতাংশ বা প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মানুষ বসবাস করছে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে। এ ধরনের দারিদ্র্যের হার শহরের তুলনায় গ্রামে প্রায় দ্বিগুণ। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মধ্যে বেশি। সবচেয়ে বেশি সিলেট বিভাগে। আর জেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বান্দরবানে। বিশ্বের দারিদ্র্য পরিমাপের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দারিদ্র্য পরিমাপে মৌলিক চাহিদার ব্যয়ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপে অর্থমূল্যভিত্তিক দারিদ্র্যের এই হিসাব পাওয়া যায়। কিন্তু জাতিসংঘ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের পদ্ধতিতে দারিদ্র্যের সব দিক ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বঞ্চনার প্রকৃত চিত্র ওঠে আসে না। তাই দারিদ্র্য-বঞ্চনার বিভিন্ন বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ দিতে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুসরণ করতে বলা হয়েছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে (এসডিজি)। জিইডির বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই) প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে ২০১৯ সালের বিবিএস মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) তথ্যের ভিত্তিতে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মানের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বিশ্লেষণ করে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতি দেখা হয়েছে। এজন্য বিবিএস, ইউনিসেফ, অক্সফোর্ড মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এবং বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়েছে জিইডি।

দেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের চিত্র সম্পর্কে এমপিআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৩ কোটি ৯৮ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে আছে। মোট জনসংখ্যার ২৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিকভাবে দরিদ্র। উল্লেখ্য, বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের এ হার সাধারণ দারিদ্র্যের হারের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপে (২০২২) দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। জিইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রাম এলাকায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার শহরাঞ্চলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। গ্রামাঞ্চলে এ হার ২৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। শিশুদের মধ্যে এ হার ২৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

এই এমপিআই প্রতিবেদনে অনুসারে দেখা যায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি সিলেট বিভাগে। এ বিভাগে ৩৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ময়মনসিংহ বিভাগ। বিভাগটির ৩৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বরিশাল বিভাগে এ হার ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে থাকা বিভাগগুলোতে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে চট্টগ্রাম ২৭ দশমিক ২৪, রংপুর ২৫ দশমিক শূন্য ৪, রাজশাহী ২২ দশমিক ২৬, ঢাকা ১৬ দশমিক ৯৫ ও খুলনা ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ। তবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। এ বিভাগের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। সংখ্যার হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকা বিভাগে বহুমাত্রিক দরিদ্র মানুষ ৭৫ লাখের বেশি। জেলাভিত্তিক হিসাবে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবেচেয়ে বেশি বান্দরবানে। এ জেলার ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিকভাবে দরিদ্র। শীর্ষ তিনে থাকা অন্য দুই জেলা হচ্ছেÑ কক্সবাজার (৪৭.৭০%) ও সুনামগঞ্জ (৪৭.৩৬%)। অন্যদিকে সবচেয়ে কম বহুমাত্রিক দারিদ্র্য লক্ষ করা গেছে ঝিনাইদহ জেলায়। এ জেলার ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দরিদ্র। এ ছাড়াও কম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার থাকা অন্য জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা (৯.১৯%), গাজীপুর ( ৯.৬৩%) ও যশোর (১০.৫৮%)। 

এমপিআই প্রতিবেদনে মানুষের বঞ্চনার একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে কোনো একটি নির্দিষ্ট সূচকে কত শতাংশ মানুষ বঞ্চিত, দারিদ্র্যের অবস্থান নির্বিশেষে তা প্রকাশ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বঞ্চনা দেখা গেছে আবাসন, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ, স্যানিটেশন ও সম্পদের ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬১ দশমিক ৭৯ শতাংশ মানুষ বাড়ির মেঝে, দেয়াল বা ছাদের যেকোনো একটির ক্ষেত্রে উন্নত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ৫৯ দশমিক ২৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা পায় না ৫৭ দশমিক ২২ শতাংশ মানুষ। ৪৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ মানুষের ন্যূনতম সম্পদ নেই। কিছু সূচকে বঞ্চনার হার তুলনামূলকভাবে কম। যেমনÑ ৫ শতাংশ মানুষ প্রজনন স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত, বিদ্যুৎ সুবিধা পায় না ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ।

দারিদ্র্য, উন্নয়ন, বিমোচন এই তিনটি বিষয় অধিক আলোচিত, পর্যালোচিত ও সমালোচিত বিষয় বিশেষভাবে দারিদ্র্য বিমোচন গবেষণায় এবং দারিদ্র্যের সংজ্ঞা দীর্ঘকাল ধরে একটি বিতর্কিত বিষয় যা নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের কাছে দারিদ্র্য ব্যাখ্যা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। দারিদ্র্য যে একটি বঞ্চনা, এটি মোটামুটিভাবে স্বীকৃত। তাই দারিদ্র্যকে বঞ্চনার বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে; যেমনÑ জীবিকা, সাক্ষরতা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি। তবে এসব ব্যাখ্যার কোনোটিই অন্যটিকে একেবারে বাতিল করেনি, যার ফলে দারিদ্র্যের ব্যাখ্যার সংখ্যা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে দারিদ্র্যের কোনো এক সংজ্ঞা- যা এক সমাজে উপযুক্ত। তা যে অন্য সমাজেও প্রাসঙ্গিক হবেÑ এটি ভাবাও ঠিক না। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ ও সমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক মানবদারিদ্র্যের একটি সূচক পাওয়া প্রায় অসম্ভব। 

মানুষের সমাজ যেহেতু বৈচিত্র্যময়, চাহিদাগুলোও সমাজের সঙ্গে আপেক্ষিক হতে পারে এবং সামাজিক বৈশিষ্ট্য ও অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তাই দারিদ্র্যকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য কোনো সর্বজনীন মাপকাঠি নির্ধারণ করা কঠিন। অ্যাডাম স্মিথ তার বিখ্যাত বই ‘ওয়েলথ অব নেশনস’-এ লিনেন শার্টের একটি উদাহরণ ব্যবহার করে দারিদ্র্যের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, একটি লিনেন শার্ট অপরিহার্য কোনো কিছু নয়, তবে একটি শার্ট না থাকলে একজন দিনমজুর জনসমক্ষে আসতে বিব্রতবোধ করবেন। তাই তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে একজন ব্যক্তির সমাজে মর্যাদার সঙ্গে ও বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য তার মৌলিক চাহিদাগুলোর সমাধান করা উচিত। এই ব্যাখ্যাটি মৌলিক চাহিদাগুলো ছাড়াও সামাজিক চাহিদাগুলো সম্পর্কে কথা বলে, যা একজন ব্যক্তির যে সমাজে সে রয়েছে, সেখানে সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজন।

 অমর্ত্য সেনকে দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য সম্পর্কে সবচেয়ে ঋদ্ধ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ বলা হয়ে থাকে। তার মতে, দারিদ্র্য হলো জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা পাওয়ার জন্য ন্যূনতম সামর্থ্যের ব্যর্থতা। এই বিবেচনায় বলা যায়, দারিদ্র্য একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা, যা শুধু আয় বা ভোগের সীমাবদ্ধতা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। এটি সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সক্ষমতারও প্রশ্ন। টেকসই দারিদ্র্য নিরসনের জন্য দরকার কর্মসংস্থান ও মানবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সমন্বিত প্রচেষ্টা। সামাজিক পরিষেবাগুলোর ব্যাপক সংস্কার ছাড়া জনগণের সত্যিকারের ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন মানেই জাতীয় আয় বৃদ্ধির খতিয়ান নয়। উন্নয়ন মানে হওয়া উচিত এমন এক সমাজ গঠন, যেখানে মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্ষম হয়। নিঃসন্দেহে, টেকসই উন্নয়ন কেবল কৌশলী কর্মসূচিতে নয়, বরং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতেই নিহিত। কর্মসূচিতে নয়, বরং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতেই নিহিত।

বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কমর্সূচি প্রণয়নের কাজ চলছে বিশেষত সমাজের চলমান অসংগতিকে সহনীয় পযায়ে নিয়ে আসার জন্য এবং তারই ধারাবাহিকতায় অর্থ উপদেষ্টা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে। এখানে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বনভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণÑ যার মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন হবে এ দেশের মানুষের জীবনমানের এবং মুক্তি মিলবে বৈষম্যের দুষ্টচক্র থেকে। প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক ধারণা থেকে সরে এসে সরকার চেষ্টা করছে সামগ্রিক উন্নয়নের ধারণায় জোর দিতে। তাই প্রথাগত ভৌত অবকাঠামো তৈরির খতিয়ান তুলে ধরার পরিবর্তে এবারের বাজেটে প্রাধান্য মানুষকে। মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, জীবিকার নিরাপত্তা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ এ অত্যাবশ্যক উপাদানগুলো ছাড়া যেকোনো রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে, দুর্বল হয় সমাজের ভিত। আর তাই দরিদ্রও ‘বৈষম্য টেকসই অর্থনৈতিক অব্যবস্থার’ই ফসল।

  • অধ্যাপক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা