সাগর-রুনি দম্পতি
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১১:২৪ এএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১৫:৫৫ পিএম
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা-মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। গত ১১ আগস্ট এ প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সে প্রতিবেদন দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য ঢাকার মহানগর হাকিম মিনহাজুর রহমান নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নিজেদের বেডরুমে রহস্যজনকভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। এই সাংবাদিক দম্পতির নৃশংস খুনের ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও আলোড়ন তোলে ছিল। প্রতিবাদে সোচ্চার হন সাংবাদিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের হোতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে। কিন্তু এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এর তদন্ত কাজই সম্পন্ন হয়নি। থানা পুলিশ থেকে সিআইডি, সেখান থেকে ডিবি, তারপর র্যাব এবং সর্বশেষ তার আশ্রয় মিলেছে পিবিআইর টেবিলে। আদালত তারিখের পর তারিখ নির্ধারণ করে চলেছে এই নৃশংস খুনের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের। কিন্তু আজতক তা দাখিল হয়নি। এবারসহ মোট ১২০ বার পেছাল এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পরিবর্তনের এমন রেকর্ড আর আছে বলে মনে হয় না।
অনেকেরই মনে থাকার কথা সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন অত্যন্ত জোর গলায় বলেছিলেন, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে।’ তারপর তার জীবদ্দশাতেই পার হয় ৭ বছর ৮ মাস ৭ দিন। অর্থাৎ ১ হাজার ৪৯৯টি ‘আটচল্লিশ ঘণ্টা’। তার মৃত্যুর পর পার হয়েছে আরও পাঁচটি বছর। কিন্তু পুলিশ সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণে অনেক আলামত ও তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে গিয়ে রহস্য উদঘাটন হয়তো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বে তালাশ করলে এমন করিৎকর্মা পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা পাওয়া দুষ্কর। তবে পুরো ব্যাপারটাই তাদের ব্যর্থতা নাকি এর পেছনে ক্ষমতার উঁচু পর্যায়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা গুপ্ত হস্তক্ষেপ ভূমিকা রেখেছে, তা নিয়েও সন্দেহ-সংশয় ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আমাদের বোধ করি, এটাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, সাগর-রুনি খুন হওয়ার পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এ হত্যা-মামলার তদন্তের তদারকি তিনি স্বয়ং করবেন। কেন তিনি একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা-মামলার তদন্তের তদারকির দায়িত্ব স্বেচ্ছায় স্ব-স্কন্ধে তুলে নিয়েছিলেন, সে রহস্য আজও অজানা। তবে কেউ কেউ বলছেন, হত্যাকারীদের পরিচয় তিনি জানতেন এবং তারা ছিলেন শেখ হাসিনার খুব কাছের ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট আপনজন। তাই কোনো তদন্ত সংস্থাই যাতে সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত খুনিদের খুঁজে বের করতে না পারে, সেজন্য তিনি একটি পর্দা টেনে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সে দৃঢ় প্রত্যয়ভরা উক্তি সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডে বেদনার্ত স্বজন-সুহৃদদের মনে সে সময় ব্যথানাশক ‘আশ্চর্য মলম’-এর কাজ করেছিল বটে। বহু বছর আগে ছোট্ট টিনের ছোট্ট কৌটায় এক ধরনের ব্যথানাশক মলম পাওয়া যেত। নাম ছিল ‘আশ্চর্য মলম’, যা মালিশ করলে মাথাব্যথার তাৎক্ষণিক উপশম হতো। অবশ্য সেটা দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফল দিত না। সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত নিজে তদারকি করবেন বলে শেখ হাসিনা শোকার্ত মানুষদের বেদনা ও ক্ষোভের ব্যথায় আশ্চর্য মলম লাগিয়ে তাৎক্ষণিক প্রবোধ দিয়েছিলেন, এটা বুঝতে ‘বোকা জনগণ’কে বেশি বেগ পেতে হয়নি।
প্রশ্নটি তখনও উঠেছিল। তবে খুব জোরেশোরে নয়। কেননা, সবার ঘাড়ে তো মস্তক একটিই। তাই কেউই গলা উঁচিয়ে প্রশ্নটি করতে সাহসী হননি। প্রশ্নটি ছিলÑ দেশে এর চেয়ে বহু নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর মামলাও হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে সেসব মামলার তদন্তের ব্যাপারে কখনও তদারকি করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। সন্দেহ ছিল, তিনি হয়তো খুনিদের নিরাপত্তা বিধানকল্পে জনগণের চক্ষু ধোলাই (আইওয়াশ) করতে চেয়েছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল অল্প কিছুদিন পরেই। এক সংবাদ সম্মেলনে সাগর-রুনি হত্যা ও দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছিলেনÑ ‘সরকার তো কারও বেডরুমে পাহারা বসাতে পারবে না’। এরপরই সবাই বুঝে গিয়েছিলেন, ওই হত্যা-মামলার তদন্ত কার্যক্রমের গন্তব্য হিমাগার।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টে বি বি অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থা যে ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, সেটাকে পরবর্তী সময়ে ‘জজ মিয়া নাটক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সে ঘটনার বিতর্কিত তদন্ত এবং হাসিনা সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার এখনও দেশ-বিদেশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটনার তদন্ত যদি ‘জজ মিয়া নাটক’ হয়, তাহলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তকে আমরা কী বলে অভিহিত করব? কেউ কেউ এটাকে বলেন অন্তহীন ধারাবাহিক নাটক। অনেকটা ভারতীয় চ্যানেলগুলোর ‘ডেইলি সোপ’ স্টাইলের। যেগুলোর সহজে সমাপ্তি ঘটে না। বছরের পর বছর চলতেই থাকে।
প্রচারিত আছে, সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি রাষ্ট্রীয় তহবিল লুটপাটের এমন কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে তৎকালীন সরকার-প্রধানসহ অনেক রাঘব-বোয়ালের উজ্জ্বল মুখ হয়তো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের কবলে পতিত হতো। সুতরাং এটা সহজেই অনুমেয়, সাগর-রুনি হত্যার বিষয়ে তৎকালীন সরকার-প্রধান ও তার সহযোগী-স্যাঙাতদের সংশ্লিষ্টতার গোপন তথ্য যাতে জনসমক্ষে না আসে সেজন্য শেখ হাসিনা একটি ধূম্রজাল ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন এক বছরের ওপরে। তার সরকারের পতনের পর সাগর-রুনি হত্যা-মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে খুনিদের মুখোশ উন্মোচন করার পথে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু দেশবাসী দেখতে পাচ্ছে, হাসিনা সরকার চলে গেছে, কিন্তু বাধা সরেনি এই চাঞ্চল্যকর হত্যা-মামলার তদন্তের পথ থেকে। তবে সে অদৃশ্য বাধার হোতা কারা, কেনই-বা তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এখনও, তা কেউই পরিষ্কার করে বলছে না। পিবিআই আদালতের কাছে সময় চায়, আদালত কোনো আপত্তি না করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করে দেন। সেই নতুন তারিখে পিবিআই আবার নতুন করে সময় প্রার্থনা করে, আদালত তা আবারও মঞ্জুর করেন। এ নাটক দেখতে দেখতে দেশবাসী এখন ক্লান্ত। তাদের প্রশ্নÑ এ তদন্ত নাটকের শেষ কোথায়?
ছেলেবেলায় স্কুল পাঠ্য বইয়ে একটি গল্প পড়েছিলাম ‘ফুয়াদের গল্প বলা’ শিরোনামে। গল্পটি আমাদের প্রজন্মের সবারই জানা থাকার কথা। বাদশাহ তার পুত্রের জন্য একজন বুদ্ধিমান বন্ধু নির্বাচন করবেন। প্রার্থী অনেকেই আসে, কথা বলে। কিন্তু কাউকেই বাদশাহর তেমন বুদ্ধিমান হয় না। অবশেষে আসে ফুয়াদ নামে এক দরিদ্র বালক। সে গল্প বলতে শুরু করেÑ ‘একটি ঘরের চালার নিচে চড়ুই পাখির বাসা। চড়ুইটি প্রতিদিনই ফুরুৎ করে ঘরে ঢোকে আর বেরিয়ে যায়। আবার ঢোকে, আবার বেরিয়ে যায়।’ এ পর্যন্ত বলে ফুয়াদ থামে। বাদশাহ জিজ্ঞেস করেন, তারপর? ফুয়াদ বলে ‘ফুরুৎ’। বাদশাহ আবার বলেনÑ তারপর? ফুয়াদ বলে ‘ফুরুৎ’। বাদশাহ যতবার জিজ্ঞেস করে, তারপর? ফুয়াদ জবাব দেয় ফুরুৎ। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর বাদশাহ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই ফুরুৎ আর কতক্ষণ চলিবে?’ ফুয়াদের চটপট জবাব, ‘চড়ুই পাখি যতক্ষণ আসা-যাওয়া করিবে, ‘ফুরুৎও ততক্ষণ চলিবে।’ বাদশাহ বুঝতে পারলেন ছেলেটি বুদ্ধিমান।
বোধ করি দেশে আদালত যতদিন থাকবে, সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন নতুন তারিখও ততদিন পড়তেই থাকবে।