পরিপ্রেক্ষিত
ফজলে মিনহাজ
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১১:২২ এএম
সম্প্রতি ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়েই চোখে পড়ল অগ্রজ সাংবাদিক ও লেখক মারুফ কামাল খান ভাইয়ের একটি স্ট্যাটাস। তিনি লিখেছেন, ‘যে অবস্থায় ড. ইউনূস দায়িত্ব নিয়েছেন, তাতে আমার ধারণা এর চেয়ে ভালো রাষ্ট্র চালানো আর কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না।’
এই স্ট্যাটাস পড়ার পর আমিও ভাবনায় পড়লাম। আসলেই কি তাই? প্রফেসর ইউনূসের বিকল্প কেউ কি ছিলেন নাÑ যিনি হয়তো আরও ভালোভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারতেন? কিছু সৎ, শিক্ষিত ও মার্জিত মানুষের মুখ মনে পড়লেও বাস্তবতা হলোÑএক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, অন্য যে কেউ এ দায়িত্ব নিলে হয়তো তিন মাস অন্তর সরকার পরিবর্তন হতো। শেষে হয়তো কোনো কল্পিত সরকার হঠাৎ তত্ত্বাবধায়ক সাজে একটা ‘যেন-তেন’ নির্বাচন দিয়ে দায়মুক্তি চাইত। আমার চিন্তার সঙ্গে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে। তবে মনে হয়, এটাই বাস্তবতা।
প্রায় ১৫ বছরের একটা ফ্যাসিস্ট রেজিম উচ্ছেদ হলো, সেই রেজিমটার রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো লাইসেন্স ছিল না। এককথায় লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায়। যার উন্মাদনায় ও বেপরোয়া গতিতে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল, যার চাকার নিচে পিষ্ট হয় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। শুধু তার ক্ষমতার স্টিয়ারিংটাই সে বুঝত। আর তাই বিচারিক হত্যাকাণ্ড, খুন, গুম, হামলা-মামলা, বিরোধী মত দমন, আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতন এসবকে সে পরোয়াই করত না।
প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, পুলিশ, মিডিয়াÑ সবকিছুতে একক দলীয় আধিপত্য। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি বাজার ও বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত দলীয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল।
অবশেষে ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত গণঅভ্যুত্থান সেই রেজিমকে বিদায় করে। নানা অনিশ্চয়তার মাঝে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সর্বসম্মত মতেই দায়িত্ব দেওয়া হয় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি হাতে নেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা অর্থনীতি আর ঘুণেধরা ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
তার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্রÑ বিচার বিভাগের মাধ্যমে জুডিসিয়াল ক্যুর চেষ্টা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত, দাবি আদায়ের প্রায় ২০০টি আন্দোলন, প্রশাসন ও সামরিক-আধাসামরিক কাঠামোর ভেতর নানা অপচেষ্টা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থেকেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর বড় অংশ থেকেছে অসহযোগিতামূলক। ফলে সরকার তার রুটিন কাজেও হোঁচট খেয়েছে। আর এই ব্যর্থতাকে ইস্যু করে নতুন ষড়যন্ত্রকারীরা মাঠে সক্রিয় থেকেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা যে কাজটি সবার আগে গুরুত্বের সঙ্গে হাতে নিয়েছেন, তা হলো উদার পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা। বিশেষ করে চীন, পাকিস্তান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার’, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রÑ সবাইকে তিনি বাংলাদেশের নিকটতম অংশীদার হিসেবে দেখছেন। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে তুলেছেন, আগামী দিনে কেমন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান তার রূপরেখা।
পতিত সরকার বাংলাদেশকে ভারতের সেবাদাসে পরিণত করেছিল। কিন্তু ড. ইউনূস দৃঢ়চিত্তে ও সাহসী কণ্ঠে সেই অপমানজনক অবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। তার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার অঙ্গীকার ঘোষণা করে ইতোমধ্যেই দিল্লির নীতিনির্ধারকদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মধ্যে সরকারের নেওয়া অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছে।
ঝিমিয়ে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সবল করে তুলছেন। বিদেশে পাচার হওয়া হাজার কোটি টাকার মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। তবে এখনও পাচার হওয়া টাকা ফেরত না এলেও, পাচার রোধ করা হয়েছে। বিশেষ করে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
উল্লেখযোগ্য যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ২০% ট্যারিফ হার নির্ধারণে সফল হয়েছে, যা শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশের হারের (১৯-২০%) সঙ্গে তুলনামূলক সমান। ফলে বাংলাদেশি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর ইউনূসকে যেভাবে মসজিদে ইমাম থেকে মন্দিরের পুরোহিত, খেটে খাওয়া মানুষ, ছাত্র-জনতা সবাই মিলে গ্রহণ করেছেন, তার মান তিনি রাখবেন বলে বিশ্বাস করি।
তিনি সে মায়ের জন্য কাজ করে যাবেন, যার সন্তান বুকের রক্ত দিয়ে তাকে রাষ্ট্র সংস্কারের আশায় ক্ষমতায় বসিয়েছেন, তিনি সে বাবার জন্য কাজ করবেন যে বাবা এখনও তার সন্তানকে খুঁজে বেড়ায়, তিনি সে সন্তানের যারা তার বাবাকে এখন চুমু খেতে চায়, সে বাসার দারোয়ানেরÑ যে দারোয়ান শিক্ষার্থীদের পুলিশ বন্দুকের নল থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই রিকশাওয়ালা ভাইয়েদের যারা জুলাই আন্দোলনের সময় শহবাগে রিকশা শোডাউন করেছিলেন, খেটে খাওয়া মানুষের, যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তিনি যেন সবার আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন। জুলাই হত্যার দৃশ্যমান বিচার, যৌক্তিক সংস্কার করে একটা সঠিক সময়ে নির্বাচন দিয়ে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
তাই প্রফেসর ইউনূসকে মনে রাখতে হবে, তিনি যেন কোনো রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের ভেতর আবদ্ধ হয়ে না যান। কারণ জনসাধারণের আস্থা তিনি। বিপদসংকুল সময়ে তিনিই বিকল্পহীন।