ক্রীড়াঙ্গন
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১১:২০ এএম
ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতি একদম ভিন্ন। আর এই সংস্কৃতি বুঝতে না পারায় আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াঙ্গনে বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে! আর এই সমস্যার আশু সমাধান কী হবে বলা মুশকিল। ক্রীড়াঙ্গন তো সব সময় সামনে তাকাতে চায়। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের স্বাধীনতার পর থেকে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অগোছালো অবস্থা থেকে মুক্তি ঘটেনি।
ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এবং ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র বাংলাদেশের মানুষকে বঞ্চিত এবং রুদ্ধ করে রেখেছিল। ক্রীড়াঙ্গনও তার বাইরে ছিল না। পাকিস্তান থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা, জাতিসত্তা। আগেই উল্লেখ করেছি, প্রথম থেকেই ক্রীড়াঙ্গনে সাংগঠনিক দক্ষতার অভাব ছিল। উদ্যোক্তাসুলভ গুণ ছিল কম মানুষের। এর কারণ হলো পাকিস্তান শাসনগোষ্ঠী সব সময় চেয়েছে ক্রীড়াঙ্গন থেকে বাঙালি সংগঠকদের দূরে সরিয়ে রাখতে। এতে করে বাঙালিদের মধ্যে সাংগঠনিক গুণাবলির জন্ম হয়নি। প্রথম দিকে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে যে শূন্যতা ছিল সেটি পাঁচ যুগ পরেও সহনীয় অবস্থায় আসেনিÑ এটি দুঃখজনক।
ক্রীড়াঙ্গনকে বুঝতে পারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বুঝতে হবে একদম তৃণমূল থেকে কীভাবে, কাদের দ্বারা ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হচ্ছে। সবাই পরিবর্তন চান। পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তবে সেই পরিবর্তন তো হতে হবে যুক্তিসংগত এবং ক্রীড়াচর্চার অনুকূলে। কোনো অবস্থাতেই চলমান ক্রীড়াচর্চাকে সংকুচিত বা বাধাগ্রস্ত করে নয়। আর এটিও সবাই বোঝেন রাতারাতি ক্রীড়াঙ্গনে সব পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞ মানুষ যারা ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছেন, তারা কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনের গভীরতার মধ্যে ঢুকে কথা বলেন না। সংস্কার তো বাস্তবায়নের বিষয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনকেও ঝাঁকুনি দিয়েছে। এটির দরকার ছিল। সবাই বিষয়টিকে আশাবাদী মন নিয়েই দেখেছেন। এক বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পর সংগতভাবেই প্রশ্ন উঠেছে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সম্ভাবনা এবং সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনের প্রেক্ষাপটে সেটি কতটুকু বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে যারা ক্রীড়াঙ্গনকে খুব কাছ থেকে অনুসরণ করেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ হলো যে চেতনা নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের নবযাত্রা শুরু হয়েছিল পাঁচ যুগ আগে সেই ক্রীড়াঙ্গনের হিসাব এখনও এলোমেলো। ক্রীড়াঙ্গন লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সাধন থেকে অনেক দূরে পড়ে আছে। মূল্যবান মানবসম্পদ এবং মেধার অপচয় হয়েছে। ক্রীড়াঙ্গন মূল্যবান সময় পার করেছে দিগ্ভ্রান্তভাবে। ভাবা যায় ক্রীড়াঙ্গনে এতগুলো বছরেও খেলার চর্চা এবং পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। ক্রীড়াঙ্গনে নেই সময়ের উপযোগী ‘ক্রীড়ানীতি’। অনেক আগে একবার ‘ক্রীড়ানীতি’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। সময় এবং চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এটি এখন আর কার্যকরী নয়। ক্রীড়াঙ্গনে ক্রীড়ানীতি প্রণয়নের দায়িত্ব সরকারের নয় সংগঠকদের। সংগঠকরা তাদের দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের সুবিধা হলোÑ জবাবদিহিতা নেই। এতে করে ক্রীড়াঙ্গন চলেছে দিগ্ভ্রান্তভাবে। হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া সাফল্য নিয়ে উচ্ছ্বাস আর তৃপ্তিতে ভোগা। ক্রীড়াঙ্গনে দরকার ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাফল্যÑ এই বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। সব সময় চলছে নিজের সঙ্গে ফাঁকির খেলা। এতে করে ক্রীড়াঙ্গন এতগুলো বছর পর যে অবস্থানে থাকা উচিত ছিল, সেই অবস্থান থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ক্রীড়াঙ্গন ভুগছে আস্থার সংকটে।
মানুষ যে ক্রীড়াঙ্গন প্রত্যাশা করে সেই ক্রীড়াঙ্গন দেখতে পাচ্ছে না। দলীয় রাজনীতি, কর্তৃত্ববাদিতা, বিভাজন, হিংসা, স্ববিরোধিতা এবং অনৈক্য ক্রীড়াঙ্গনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ক্রীড়াঙ্গন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহৃত হচ্ছে। সবকিছু বুঝেও সুন্দর সুন্দর কথা বলা এবং অবাস্তব আশ্বাস প্রদান হতাশার জন্ম দিচ্ছে। নারী ফুটবলাররা ধারাবাহিকতার সঙ্গে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে এগিয়ে চলেছেন, তাদের প্র্যাকটিস করার জন্য একটি পৃথক মাঠ যেখানে নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্টেডিয়াম নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে। আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, বিভাগে বড় স্টেডিয়াম নির্মাণের। নারী ফুটবলাররা নিয়মিতভাবে বেতন পান না। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুরস্কারের অর্থ মাসের পর মাস অপেক্ষার পর মিলছে না। নারী ফুটবলাররা ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলতে যাওয়ার আগে হাজার সমস্যায় ভোগেন। তাদের আবাসিক হোস্টেলটি স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ভালো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। ফুটবল সংগঠকরা এখন ভীষণ ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। এই ক্ষেত্রে মিডিয়াতে লক্ষণীয় হচ্ছে, যা রীতিমতো প্রতিযোগিতা।
সব সময় বলাই হয়, তৃণমূল পর্যায় থেকে সবগুলো খেলার চর্চাকে বেগবান করতে না পারলে লাভ হবে না। মফস্বলের সংগঠকরা খেলাধুলা চালাতে যেয়ে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তৃণমূল পর্যায়ে যারা ক্রীড়াঙ্গনে সংগঠক হিসেবে পরিচিত এদের অধিকাংশের আর্থিক সংগতি সীমাবদ্ধ। এটি বাস্তবতা। খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ আর ভালোবাসার পরিপ্রেক্ষিতে এই মানুষগুলো নিজেদের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন। তারা কখনও প্রতিদানের পেছনে দৌড়ান না। সাধ্যমতো চেষ্টা করেন খেলার আয়োজনের। কখনও সম্ভব হয়। কখনও হয় না। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থ সংকট। জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে খেলার আয়োজনের জন্য দরকার অর্থের। এই অর্থ জোগাড় হবে কীভাবে? সরকার তো তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন খেলার চর্চা এবং কম্পিটিশন আয়োজনের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে না। সরকার একটি নীতিমালার আওতায় ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুদান দিয়ে থাকে। তবে এই অনুদান পর্যাপ্ত নয়। আর এটি আশা করাও উচিত নয়। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সার্বিকভাবে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
জেলা পর্যায়ে আগের তুলনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক বেড়েছে। সমস্যা হলো জেলা পর্যায়ে আর্থিক সংগতিপূর্ণ মানুষদের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে উৎসাহ কম। তারা সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করতে চান না বিভিন্ন কারণে। আগে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই সাপোর্ট ছিল। আর তাই বড় এবং ছোট আকারে খেলায় চর্চা এবং নিয়মিতভাবে ‘কম্পিটিশনের’ আয়োজন সম্ভব হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি এবং সামাজিক পর্যায়ে মূল্যবোধ এবং চিন্তাভাবনা পাল্টে গেছে। ক্রীড়াঙ্গনে কিছু কিছু বিষয় নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগা হচ্ছে। ‘আমরা’ থেকে ‘আমিত্ব’ বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি ভালো লক্ষণ নয়। ক্রীড়াঙ্গনে অনেক কাজকর্ম অদ্ভুত এবং বিভ্রান্তিকরÑ যেটি কাম্য নয়। অযৌক্তিক আচরণ ক্রীড়াঙ্গনে অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। সহনশীলতার অভাব এবং একের প্রতি অপরের ‘রেসপেক্ট’ বোধ না থাকলে ক্রীড়াঙ্গনে নৈতিকতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হবে বারবার। ক্রীড়াঙ্গনে সংবেদনশীলতা বিসর্জন দিলে তো কিছুই থাকবে না।