× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

শিক্ষা : আঁধারের সংকেত

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৫ ১২:১৪ পিএম

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৫ ১৯:০১ পিএম

হোসেন আবদুল মান্নান

হোসেন আবদুল মান্নান

সম্প্রতি একটা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের ভাষ্যমতে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি গুরুদয়াল কলেজসহ দেশের অনেকগুলো কলেজে শিক্ষকদের রহস্যজনক অনুপস্থিতি। বলা হয়েছে এরা বিনা ছুটিতে, বিনা কারণে দিনের পর দিন অনুপস্থিত আছেন। গুরুদয়াল কলেজ নিজের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের প্রিয় প্রতিষ্ঠান বিধায় সংবাদটি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিচ্ছে বা কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানা যায়নি, তবে সংবাদ বা গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে তা ওঠে এসেছে জনসমক্ষে। 

জানা যায়, অনুপস্থিত শিক্ষকদের অনেকেই যথারীতি তাদের বেতন-ভাতাদি গ্রহণ করে চলেছেন। কারণ ডিজিটাল যুগে এখন বেতন গ্রহণের জন্য কলেজে যেতে হয় না। ব্যাংক হিসেবে যথাসময়ে তা জমা হয়ে যায়। তাদের পদোন্নতিও হবে যথাসময়ে এবং আরও জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। তার ওপর তারা সবাই বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার সার্ভিসের সদস্য। তারা নিজেরাও দাবি করেন, তারা শিক্ষক নন, প্রথম শ্রেণির ক্যাডার কর্মকর্তা। তারা সরকারি চাকরি করেন। তাদের বিচরণ সর্বত্র এবং বহুমুখী। তাদের হাজিরা নিষ্প্রয়োজন। বায়োমেট্রিক হাজিরা রাখার তো প্রশ্নই ওঠে না। শোনা যায়, আজকাল সরকারি কলেজগুলোতে অধ্যক্ষই সবচেয়ে অসহায়। তারা তাদের সহকর্মীদের ওপর নির্দেশনার নিয়ন্ত্রণ প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের দাপ্তরিক সম্পর্ক নিবিড় নয়; যা বেসরকারি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কমবেশি এখনও টিকে আছে। কেননা সেখানে চাকরির ঝুঁকি আছে। যদিও সরকারি কর্মচারী মানে ক্রমাগত স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার অবকাশ নেই। তিনি কখনও দায়হীন স্বাধীন নন।

এদেশে সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থলে বা অফিসে নিয়মিত উপস্থিতি বিষয়ে নানা সময়ে নানা বিধিবিধান জারি করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি করা হয়েছিল সত্তর এবং আশির দশকে সামরিক শাসন চলাকালে। সেসময় গণকর্মচারী শৃঙ্খলা (নিয়মিত উপস্থিতি) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ করা হয়েছিল; যা সংবিধানের ভাষায় সব কর্মচারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। এতে বলা আছে, ‘কোনো গণকর্মচারী তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে ছুটিতে গেলে বা কাজে অনুপস্থিত থাকলে কর্তৃপক্ষ প্রতিদিনের অনুপস্থিতির জন্য উক্ত কর্মচারীর ১ (এক) দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কর্তন করবেন।’ তা ছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) ১৯৮৫ বিধিমালাবা আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯ মোতাবেক কর্তৃপক্ষ এদের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। যতদূর জানি এ বিধিবিধানগুলো এখনও বহাল তবিয়তে আছে। সরকারি কর্মচারীরাও এগুলো পাঠ করেন, আলোচনা করেন, বিভাগীয় পরীক্ষা পাসের নিমিত্ত। মুখস্থ করেন। শুধু কর্মক্ষেত্রে এসবের বাস্তব প্রয়োগ নেই। এমনকি কোনো অভ্যাসগত অপরাধীর ওপরও এর যথাযথ ব্যবস্থা নেই। 

বলা বাহুল্য, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রধান কার্যালয় বাংলাদেশ সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি বিষয়ে বরঞ্চ একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। সেখানে বায়োমেট্রিক অ্যাটেন্টডেন্সের ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি সিনিয়র কর্মকর্তারাও কখন অফিসে প্রবেশ বা প্রস্থান করলেন এর প্রমাণ কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে যাচ্ছে। সেখানে ই-নথি, ডি-নথি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ভ্রাম্যমাণ অবস্থায়ও তার উপস্থিতি জানান দেওয়ার পদ্ধতি বহাল আছে। দৈনন্দিন আউটলুক ম্যাসেঞ্জারেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আজকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অধস্তন কর্মচারী অনুপস্থিত থাকলে তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে। কিন্তু দেশের শত শত সরকারি কলেজে সরকারের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা দাবিদার তরুণ তথা জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা কলেজে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকতে পারছেন অবলীলায়। অথচ আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদে তার গতিবিধির ওপর নজর রাখা কোনো দুরূহ বিষয় নয়। এটাকে স্রেফ বলা যায়, সুশাসনের বিপরীতে বিদ্যমান একপ্রকার নৈরাজ্যের আলামত। আর এই আলামত এক দিনের নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অপব্যবস্থার অংশ। 

একটা ছোট্ট বেসরকারি কলেজ চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানাবিধ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা খুব সাধারণ কিছু নয়, অসাধারণ এবং বহুমাত্রিক। কয়েক দিন আগে, কলেজে ছাত্রীদের উপস্থিতি এত কম কেনÑ তা জানতে চাই শিক্ষকদের কাছে। তারা জানান, ছাত্রীরা যুক্তি দিয়ে বলে, এদের বান্ধবীরা যারা সরকারি কলেজে পড়ে, তারা নিয়মিত কলেজে যায় না। কালেভদ্রে যায়। তারা পরীক্ষার ৩-৪ মাস আগে সংশ্লিষ্ট স্যারদের কাছে প্রাইভেট কোর্সে ভর্তি হয়ে যায় এবং তিনি তার তৈরি করা শিট দিয়ে দেন এতেই পাস নিশ্চিত করে দেওয়া হয়। কলেজে গিয়ে হাজিরার প্রয়োজন হয় না। এমনকি হাজিরা বা পার্সেন্টেজ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। আর এটা একটা নতুন ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এখানে প্রতিদিন আসতে হবে কেন? 

যদি ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির দায় না থাকে, শিক্ষকেরও দায় না থাকে; তাহলে প্রতিষ্ঠানের আকাশচুম্বী অট্টালিকাসমূহের কী হবে? গত কয়েক বছরের চলমান চিত্র থেকে জানা যায়, ছাত্রছাত্রী ভর্তি, পরীক্ষার খাতা দেখার পরীক্ষক, প্রধান পরীক্ষক, নীরিক্ষক, সংশ্লিষ্ট বোর্ড অফিস, শিক্ষকশ্রেণি, সবকিছু একাকার হয়ে গেছে। এখন পুরো ব্যবস্থাটাই এক অদৃশ্য অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পথে। প্রতি বছর পাসের হার, জিপিএ নামক উদ্ভট সোনার হরিণ অধিকসংখ্যক হারে দেখানোর জন্য বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া থাকত। সেক্ষেত্রে পাসের জন্য শিক্ষার্থীর উত্তম প্রস্তুতি, ভালো পরীক্ষা দেওয়ার চেয়ে যেন সরকারেরই দায় ছিল অনেক বেশি। শিক্ষার্থীরা দয়া করে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে অংশ নিয়েছে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। খাতায় নম্বর দেওয়ার দায়িত্ব ছিল অন্যের ওপর। 

আবার এমনও শোনা যায়, কিছু কিছু স্কুল-কলেজে কাগজে-কলমে প্রয়োজনীয় ছাত্রছাত্রীর অস্তিত্ব নেই। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছাত্রছাত্রী নেওয়া যায়। কোথাকার ছাত্রছাত্রী জানা দরকার নেই, তবে একই বোর্ডের অধীনে যেকোনো স্কুল বা কলেজ থেকে পরীক্ষার দেওয়ার ব্যবস্থা বোর্ডই করে দিচ্ছে। এটাকে বলা যায়, বোর্ড ছাত্রছাত্রী ভাড়া দিচ্ছে। এদিকে স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, এদের পাসের হার শতকরা…! অথচ ছাত্রছাত্রীরা সে প্রতিষ্ঠানকেই চিনে না। সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হাতেগোনা কতিপয় বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদ দিলে, মনে হয়, গোটা ব্যবস্থাই চলে গেছে বাণিজ্যিকীকরণের আওতায়। তাহলে কি প্রতিদিন এমন এক ভয়াবহ আত্মঘাতী পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে দেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী ও অনাগত প্রজন্ম?

  • গল্পকার ও কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা