সিপিডির গবেষণা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৫ ১২:০৪ পিএম
বাংলাদেশ একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে অগ্রসরমান জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে জ্বালানির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাহিদা মেটাতে পরিবেশবান্ধব এবং ব্যয় সংকোচননীতি বিবেচনায় প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। তবে চাহিদার প্রেক্ষিতে এ খাতের ব্যাপকতা দৃশ্যমান হলেও জ্বালানি পরিকল্পনায় অসামঞ্জস্যতা, নীতিমালার দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক তহবিল ও দেশীয় বিনিয়োগের অভাব এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার অপ্রতুলতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ছে না, ব্যাহত হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ অথচ জীবাশ্ম জ্বালানির অংশ ৪৩.৪ শতাংশ। ২৪ আগস্ট সিপিডিরÑ “২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্মূল্যায়ন : ‘স্মার্ট’ লক্ষ্য ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পূর্বাভাস” শীর্ষক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য পূরণ না হলে বিদ্যুৎ খাত আরও বেশি কার্বননির্ভর হয়ে পড়বে, যা আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকবে।
২৫ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘হুমকির মুখে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। তার জন্য প্রয়োজন ৩৫ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা। এতে বিনিয়োগ প্রয়োজন ৩৫.২ থেকে ৪২.৬ বিলিয়ন ডলার। সিপিডির হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা হওয়া দরকার ১৮,১৬২ মেগাওয়াট। বর্তমান পরিকল্পনায় রয়েছে ১,৯৬৭ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৬,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। গবেষণা বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ দরকার ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সময়কালে। মোট ২৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ক্ষেত্রে সৌর বিদ্যুতের জন্য ১৬.৫ বিলিয়ন, বায়ুশক্তির জন্য ১২.৬ বিলিয়ন, জলবিদ্যুতের জন্য ৬ বিলিয়ন এবং বিদ্যুৎ আমদানি ও অন্যান্য খাতে ৭.৪ বিলিয়ন। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১,৫৫০.৫৬ মেগাওয়াট, যার মধ্যে সৌরশক্তি ১,২৫৬.৫৭ মেগাওয়াট, বায়ুশক্তি ৬২.৯ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ ২৩০ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ ০.৬৯ মেগাওয়াট এবং বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ ০.৪ মেগাওয়াট উৎপাদিত হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, সৌরশক্তি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩১,১৯৪ মেগাওয়াট। যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মাত্র ১,১৭০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। তবে আশার কথা নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে সরকারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৪,১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে বিনিয়োগ ব্যয় ছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে আরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এই খাতে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এর ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে আমাদের মতো জনবহুল দেশে। এই খাতে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এই ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে। এ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সীমিত আকারে সহায়তা করছে, আগামীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অবদান রাখবে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার সোলার হোম সিস্টেম, সোলার মিনি গ্রিড এবং নেট মিটারিং পদ্ধতি চালু করেছে। দেশে ইতোমধ্যে ৬ মিলিয়নেরও বেশি সোলার হোম সিস্টেম ইনস্টল করা হয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অফ-গ্রিড সোলার প্রোগ্রাম হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়া বায়ুশক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য কক্সবাজার এবং কুয়াকাটায় বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কাপ্তাই হাইড্রোপাওয়ার প্ল্যান্ট জাতীয় গ্রিডে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু নদীতে ছোট আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব।
আমরাও মনে করি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। সৌরশক্তির ব্যাপক ব্যবহার, বায়ুশক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানো, বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে সিপিডি তাদের প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে সমন্বিতভাবে ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য লক্ষ্য গ্রহণ, ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের জন্য স্পষ্ট মাইলফলক নির্ধারণসহ নানাবিধ সুপারিশ। সরকার নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি খাত গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি রোল মডেল হিসেবে বিশ্ব দরবারে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারি।