প্রেক্ষাপট
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৮ এএম
প্রতীকী ছবি
২০২৫ সালের মে মাসে ঢাকায় এক কিশোরের মৃত্যুর খবর সবকিছু থমকে দেয়। দশম শ্রেণির ওই ছেলে একাকী নিজেকে ভয়াবহ মানসিক চাপের কাছে হারিয়ে তার মা, যিনি কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ছেলে টিকটক-এ ভিডিও দিলে লাইক কম পেলে হতাশ হয়ে যেত। একদিন সকালে দরজায় আটকা ছিল, দরজা খুলতেই দেখলাম সে রশিতে ঝুঁলে...’ এই কান্না শুধু এক মায়ের নয়, এটি দেশের বহু পরিবারের। আধুনিক প্রযুক্তির ঝাঁপটায় কিশোরেরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তারা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার এক অদৃশ্য জালে আটকা পড়ে। এর পরিণতি ভয়াবহ।
এ কান্না আমাদের জানায়, শুধু ভিউ আর লাইক নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা, মানসিক সহায়তা আর ঘরে-বাইরে সবাইকে সুরক্ষা দেওয়া। একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, নয়তো হারিয়ে যাবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
এখন একটা শিশুর জন্মদিন মানেই ছবি তোলা, ভিডিও করা, আর কেক কাটার আগে মোবাইলের ক্যামেরা ঠিকঠাক করা। যেন সবই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়ার জন্য। শিশুর কান্না, হাসি, কিংবা অসুস্থতা, সবকিছুই এখন ইউটিউব বা ফেসবুকের কনটেন্ট হয়ে যাচ্ছে। না চাইলেও ওদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি অভিব্যক্তি ক্যামেরায় বন্দি হয়ে যাচ্ছে। এতে ওরা অনেক সময় মানসিক চাপে পড়ে যাচ্ছে। এমন অতিরিক্ত প্রকাশের অভ্যাস থেকে একরকম ক্লান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে, যেটা অনেকেই এখন ডিজিটাল ট্রমা বলে দেখছেন।
করোনার সময় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত হয়েছে। শিক্ষকরা শিখেছেন কীভাবে জুম বা গুগল মিট-এ ক্লাস নিতে হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা শেখেনি অনলাইনে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয়, কিংবা কোনটা বাস্তব ভালোবাসা আর কোনটা ভুয়া লাইকের প্রতিক্রিয়া।
পাঠ্যপুস্তকে এখনও ডিজিটাল আচরণ, অনলাইন শালীনতা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে কিছুই নেই। ফলে শিশুরা শুরু থেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। এমনকি অনেক অভিভাবকও না বুঝেই সন্তানের প্রতিটি ছবি, ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরছেন। কিন্তু এই শেয়ার করার অভ্যাসই আসলে অনেক শিশুর মনের ভেতরে অজানা এক অস্থিরতা ও দুর্বলতা তৈরি করে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এখন আত্মহত্যা। অথচ আমাদের দেশে নেই কোনো বিদ্যালয়ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, নেই নিয়মিত আলোচনা সভা, নেই এমন কোনো জায়গা যেখানে কিশোররা তাদের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা খুলে বলার সুযোগ পায়। এই শূন্যতা পুষিয়ে দিচ্ছে স্ক্রিন, কিন্তু তা নয় শান্তির বরং নিঃসঙ্গ মৃত্যুর প্রতিধ্বনি। মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং বিষয়টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু থাকলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এখন তা স্কুলে চালু করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিশুদের জন্য ডিজিটাল সুরক্ষা পরিকল্পনা তাই এখন জরুরি। এই সামাজিক সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কেবল প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, চাই মানসিক স্বাস্থ্য, নৈতিকতা এবং পারিবারিক বন্ধনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। এজন্য প্রতিটি স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলর নিয়োগ, পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল শালীনতা ও অনলাইন আচরণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত, অভিভাবকদের জন্য নিয়মিত সাইবার সাইকোলজি বিষয়ক ওয়ার্কশপ চালু করা, প্রতি মাসে ‘ডিজিটাল ডিটক্স ডে’ পালন, যেখানে পরিবার ও বিদ্যালয়ে স্ক্রিনবিহীন সময় কাটানো হবে এবং একটি জাতীয় শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা এবং গবেষণা কেন্দ্র গঠন এই পদক্ষেপগুলো শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়Ñ বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজÑ তিনটি স্তম্ভকেই একযোগে কাজ করতে হবে।
শিশুরা শুধু ক্যামেরার সামনে হাসার জন্য নয়, তারা শান্তি আর ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে ওঠার অধিকার রাখে। আমরা চাই, তাদের চোখে-মুখে দেখা যাক সত্যিকারের আনন্দের আলো, কৃত্রিম ভঙ্গির নয়। কিন্তু যদি ওদের ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দুনিয়ায় হারিয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন শুধু কথার মধ্যে থাকবে, আর বাস্তবে তৈরি হবে এমন এক প্রজন্ম, যারা ভিউয়ের পেছনে দৌড়ে নিজের পরিচয়ই ভুলে যাবে। তাই এখনই সময়Ñ আমরা যেন সেই শিশুর কান্নাকে অবহেলা না করি। তাদের মনের কথা শুনি, ভালোবাসার জায়গা থেকে পাশে থাকি। এটুকুই হতে পারে এক নতুন বিপ্লবের শুরু, যেখানে শিরোনাম হবে মানবতা, আর নেতৃত্বে থাকবে হৃদয়।