সাদা পাথর
ড. মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৩ এএম
নদী, পাহাড়, ঝরনা, জল, চিক চিক সাদা বালি ও পাথর আমাদের প্রকৃতি, জীবন-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেকে এ সম্পদকে সাদা সোনার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। নির্মাণশিল্প থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সম্পদের ব্যাপক চাহিদা থাকায় অনেকে একে ‘সাদা সোনা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। অর্থনৈতিক মূল্য, বিপুল প্রাচুর্য এবং দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা একে সোনার খনির মর্যাদা এনে দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পদের লুণ্ঠন বাংলাদেশের প্রতি বিবেকবান মানুষকে হতবাক করেছে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে প্রাকৃতিকভাবে জমা হওয়া সাদা পাথর একদিকে যেমন পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে তা পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অথচ গত কয়েক মাস ধরে খবরের কাগজ ও টেলিভিশন রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে একদল দখলদার, মুনাফালোভী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী মাফিয়া চক্র মিলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে থেকে সাদা পাথর লুট করে নিয়েছে। পরিবেশকর্মীরা এটিকে এক ধরনের ‘মব মচ্ছব’ বা গণতান্ত্রিক লুটপাট হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়।
সংবাদমাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যে প্রাথমিক অনুসন্ধান উঠে এসেছে, তাতে জানা যাচ্ছেÑ খনিজ সম্পদ অধিদপ্তর, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কোম্পানীগঞ্জে দায়িত্ব পালনকারী ৪ জন ইউএনও, থানা ইনচার্জ এবং বিজিবি এই লুটের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এ ছাড়াও, স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট ৪২ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। জানা যায়, সাত পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদনে ১৩৭ জনের নাম উঠে এসেছে, যাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বা সক্রিয় সদস্য। ব্যাপকভাবে পাথর লুটপাটের পর সংবাদমাধ্যমের বরাতে আমরা জানতে পারি, জেলা প্রশাসন ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করছে এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যাদের ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এখন আমাদের প্রশ্ন, এই রকম ব্যাপক গণতান্ত্রিক লুটপাটের (প্রায় ৮০ শতাংশ পাথর লুট করা হয়েছে) পর কেন প্রশাসন নড়েচড়ে উঠল? এটা কি কেবলই লোক দেখানো? নাকি সত্যিকার অর্থে মাফিয়া তন্ত্র, লুটপাট, ঘুষ, দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ হবে এই দেশ থেকে?
শুধু সিলেটের সাদা পাথরই নয়, কুচক্রীদের নজর মেঘনার বালি উত্তোলনের দিকেও। মেঘনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। এই নদীর দুপাশে গড়ে উঠেছে নগর, বন্দর, জনবসতি, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পালতোলা নৌকা, মাঝির ভাটিয়ালি গান, মাছরাঙা আর পানকৌড়ির দাপাদাপি, সোনালি ইলিশ, দুই ধারে সবুজ ফসলি জমি আর সোনালি ধানের শিষ মনকে ভরিয়ে দিত নিমিষেই। এখন আর দেখা যায় না পালতোলা নৌকা বরং সেখানে শোনা যায় ইঞ্জিন নৌকার বিকট আওয়াজ, নেই মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান, দেখা যায় না মাছরাঙা আর পানকৌড়ির দাপাদাপি আর মেঘনার বুকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় ড্রেজার যেগুলো দিয়ে নদীর বুক চিরে প্রতিদিন তোলা হচ্ছে হাজার হাজার টন সাদা বালি। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, পরিবেশগত প্রভাব যাচাই ছাড়াই শত শত ড্রেজারের মাধ্যমে এই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। লাগামহীনভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর প্রবাহ এবং নিচের স্তর সরে যাচ্ছে। ফলে নদীর পাড় ভেঙে বসতবাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদী পাড়ের মানুষ অসহায়ের মতো প্রশাসনের কাছে ধরনা দিচ্ছে, মানববন্ধন করছে, স্মারকলিপি দিচ্ছে কিন্তু কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। অধিকন্তু, এই বালুখেকোরা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে, অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে দিনে দুপুরে, প্রকাশ্যে। শুধু মেঘনার বুক থেকেই নয়, সারা দেশের নদনদীতেই একই চিত্র। প্রতিদিন গণমাধ্যমে খবর আসছে। এই অবৈধ বালুর ব্যবসা নিয়ে খুনখারাবিও হচ্ছে। কিন্তু এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে প্রশ্ন জাগে, এই কুচক্রী মহলের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনও কি জড়িত? না হলে এসব কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তথা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হয় কী করে? তবে কি তাদের মধ্যের অসাধু একটি অংশও এই লুটের সঙ্গে জড়িত? এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। তাদেরকে তৎপর হতে হবে। এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন তো চলতে পারে না, চলতে দেওয়া যায় না। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্তরের কিছু অসাধু ব্যক্তির মাধ্যমে সব সময়ই রাষ্ট্রীয় সম্পদের আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন চলে। কখনও কখনও তাদের কাউকে কাউকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত কখনোই দৃশ্যমান হয়নি। তাই এসব ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশা অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সেইসঙ্গে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বালু-পাথর উত্তোলনে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নদীভাঙনকবলিত মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন স্থানীয় জনগণ ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন গড়ে তোলা।
সিলেটের সাদা পাথর আর মেঘনার সাদা বালু আমাদের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য, প্রকৃতির অবারিত দান। এই অবারিত দান শুধু নির্মাণ শিল্পের কাঁচামাল নয়, বরং আমাদের পরিবেশ ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক দখলদারত্ব, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ব্যবসায়িক সীমাহীন লোভের কারণে এই সম্পদ এখন ধ্বংসের পথে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির প্রতি অন্যায় করলে তা প্রকৃতি কোনোদিনই ক্ষমা করবে না, আজ হোক কাল হোক প্রতিশোধ নেবেই নেবে। আমরা ক্লাসে, সভা, সেমিনার, কনফারেন্স কিংবা গবেষণায় প্রতিদিন টেকসই উন্নয়নের কথা বলি। অথচ টেকসই উন্নয়নের মূল দর্শনই হলো, বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন ও স্বপ্ন বিনষ্ট না হয়। আজ যদি আমরা অতি-লোভে প্রাকৃতিক সম্পদকে লুট করি, তবে আগামী প্রজন্মকে আমরা এক ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ উপহার দিয়ে যাব। তাই এখনই সময় রাষ্ট্রকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধভাবে সিলেটের সাদা পাথর আর মেঘনার সাদা বালু উত্তোলন বন্ধ করে, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করে, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। অন্যথায়, নদীর কান্না একদিন পুরো জাতির কান্নায় পরিণত হবেÑ যার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না।