সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দেশে বহু বছর ধরে সত্যিকারের নির্বাচন নেই। বরং গত পনেরো বছরে নির্বাচনের নামে দেখতে হয়েছে তিনটি প্রহসন। রাষ্ট্র ও সরকার ভোটারদের বঞ্চিত করেছে তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ দীর্ঘদিনের অপশাসন মুক্ত হয়। পতিত সরকার বাধ্য হয় ক্ষমতা ছাড়তে। এরপর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকারের প্রধান দায়িত্বÑ একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। যার মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার আসছে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করেছে। নির্বাচনের পদ্ধতি ও নির্বাচনীয় প্রক্রিয়ায় কিছু সংশোধনী নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নেমে পড়েছে নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক তৎপরতায়। বলা যায়, দেশ এখন নির্বাচনী ট্রেনে। এই ট্রেন যেন তার নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছতে না পারে সেজন্য ইতোমধ্যে অনেক অপশক্তির সক্রিয়তার খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে। জাতি যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের রায় ঘোষণায়। যার মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক সরকার দেশ পরিচালনা করবে। তখন অতীতের মতো এবারও নির্বাচন ঘিরেও দেখা দিয়েছে কিছু শঙ্কা। বিশেষত, শোনা যাচ্ছে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। আমাদের কাগজ ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-এ প্রকাশিত ‘নির্বাচন ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি’ শিরোনামের খবরটি সেই শঙ্কারই পদধ্বনি। এ ধরনের খবরে আমরা উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত। আমরা চাই না কেউ কোনোভাবে নির্বাচনী পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাক। কারও অপতৎপরতায় নির্বাচনী উৎসবে ভাটা পড়ুক।
অতীতেও আমরা দেখেছি, নির্বাচনী ডামাডোলে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বাড়ে। লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আসে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও সন্ত্রাসীদের কদর বাড়ে। তাদেরকে নানাভাবে নানাজন পৃষ্ঠপোষকতা করে। অনেক সময়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়াতেও অপরাধীদের বাড়বাড়ন্ত লক্ষ করা যায়। নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের জন্যও রাজনৈতিক দলগুলো সন্ত্রাসীদের লালন-পালন করে। আর এই সন্ত্রাসীদের পেশিশক্তি বাড়াতে, তাদের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশের জন্য বিভিন্ন উপায়ে অস্ত্র সংগ্রহও বাড়ে। পাচার হয়েও আসে অস্ত্র। এবারও নির্বাচনী হাওয়া পালে লাগতেই অবৈধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের চাহিদার কথা জানা যাচ্ছে। ফলে অস্ত্র ব্যবসায়ী নতুন ও পুরনো মাফিয়া সিন্ডিকেটের সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠছে সীমান্তকেন্দ্রিক মাফিয়ারাও। যা কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক খবর নয়। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে দেশের ভেতরে অবৈধ অস্ত্র আসার ১০ জেলার ১৮টি রুট চিহ্নিত করেছে। আমরা মনে করি, জরুরি ভিত্তিতে এসব রুটে নজরদারি বাড়ানো দরকার। কোনোভাবেই এসব পথে তো বটেই অন্য পথেও যেন কোনো অস্ত্র প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে দেশের অনেক থানাতেই হামলার ঘটনা ঘটে। এসব থানা থেকে অনেক অস্ত্র বেহাত হয়ে যাওয়ার খবরও সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ। ওইসব বেহাত হওয়া অস্ত্রসহ দেশের ভেতরে থাকা সকল অবৈধ অস্ত্রের উৎস সন্ধান করে সেগুলো উদ্ধারে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। সরকার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার প্রক্রিয়া জারি রেখেছে। তবে নির্বাচন উপলক্ষে এই তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। আমরা জানি, অস্ত্র উদ্ধার একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, তাই বছরব্যাপীই এটা অব্যাহত রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, যেসব সন্ত্রাসী আত্মগোপনে ছিল, তারাও যেন কোনোভাবে প্রকাশ্যে এসে অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেদিকটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ঘিরে জাতির প্রত্যাশা অনেক। গত পনেরো বছর যারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তারা অপেক্ষা করছে সেই অধিকার প্রয়োগের। যারা তরুণ নতুন ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন তাদের আগ্রহ ও অপেক্ষা স্বভাবতই অনেক বেশি। জাতির সেই আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষায় কোনো অপশক্তি যেন ছেদ টানতে না পারে সেদিকটি নিশ্চিতে সকল পক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে। নির্বাচন বানচালে পতিত সরকারের সমর্থকদের অপতৎপরতার কথাও সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে অশ্রুত নয়। এদের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যুক্ত হয়, তাহলে জাতি যে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশের প্রত্যাশায় রয়েছে, তা ম্লান হয়ে যাবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে যেমন অস্ত্রবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধে আন্তরিক হতে হবে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকেও অপরাধীদের ও ছড়িয়ে থাকা অবৈধ অস্ত্র ছেঁকে তুলতে হবে। বন্ধ করে দিতে হবে অস্ত্র পাচারের সকল রুট। যাতে কোনো অপশক্তিই নির্বাচনী পরিবেশে অস্থিরতা তৈরির সামান্য সুযোগও না পায়।