ইসরায়েলি আগ্রাসন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:৪৮ পিএম
এক নির্দয়-নিষ্ঠুর সময় অতিক্রম করছে গাজায় বসবাসরত লাখো মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের ইহুদি নিধন ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়ের পর ফিলিস্তিনবাসীর জন্য এই নিষ্ঠুরতা যেন নির্মম নিয়তি। সভ্যতার এই উৎকর্ষের যুগেও এ বর্বরতা-নিষ্ঠুরতাকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে বিশ্বের ক্ষমতাধর কিছু দেশ। এ যেন মানবতার এক মহাবিপর্যয়। বলছি, গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের কথা। বলছি, উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়া লাখো মানুষের কথা। তাদের এই নিয়তির খেলা দশকের পর দশক। একসময় তাদের জমি ছিল, মাথার ওপরে ছাদ ছিল। সব দখল হয়ে গেছে। সর্বশেষ আশ্রয়টুকুও দখলের পথে। উল্লেখ করছি, বিশ্বশক্তির সহযোগিতায় ইসরায়েল কর্তৃক সংঘটিত দখল-হত্যা ও নিষ্ঠুরতার কথা। সেই গাজায় এখন দুর্ভিক্ষ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখানকার মানুষ মারাত্মক খাদ্য সংকটে ভুগছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী-শিশুরা। ক্ষুধার জ্বালায় গাজার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার। সবাই খাদ্যের সন্ধানে ছুটছে। কিন্তু যখনই খাবারের খোঁজে বের হয়, তখন জবাব হয় গুলি, পরিণাম মৃত্যু। সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে। জাতিসংঘের সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, এটা নীরব দুর্ভিক্ষ। যা প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু ইসরায়েলের বাধার কারণে খাবার পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এমন এক নির্মম বাস্তবতায়, গাজায় পূর্ণমাত্রায় দুর্ভিক্ষ চলছে বলে ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ। এর জন্য দায়ী করা হয়েছে ইসরায়েলকে। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে নিয়মিত বাধার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের একটি সংস্থা বলেছে, গাজার মানুষ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত। তাদের বক্তব্য, এই উপত্যকার পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ ‘ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর’ মুখোমুখি হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নজরদারির দায়িত্ব পালন করা জাতিসংঘের সংস্থা ‘দ্য ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (আইপিসি) বলছে, গাজায় খাদ্য নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। গাজা শহর এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি দুর্ভিক্ষের কবলে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দেইর আল-বালাহ এবং খান ইউনিস এলাকা ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’র শিকার হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। আইপিসির প্রতিবেদন আরও বলছে, গাজার দুর্ভিক্ষ ‘সম্পূর্ণরূপে মানুষের তৈরি এবং এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ২৩ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘গাজা অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা জাতিসংঘের’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি আগ্রাসনের এই সংবাদটি উঠে আসে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, এটা মানবসৃষ্ট অনাহার। ইসরায়েলের কর্তৃপক্ষ ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে গাজার পাঁচ লাখ মানুষ ভয়াবহ অনাহারে ভুগছে। মার্চের শুরুর দিকে গাজায় ত্রাণ সরবরাহ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে ইসরায়েল। এতে খাবার, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। মে মাসের শেষের দিকে সীমিত পরিমাণে সহায়তা পৌঁছানোর অনুমতি দেওয়া হলেও অবস্থার ন্যূনতম উন্নতি হয়নি। ত্রাণবাহী কিছু ট্রাক ঢুকলেও বেশিরভাগই লুট হয়ে গেছে। অনাহারি মানুষের কাছে তা পৌঁছেনি। আইপিসি বলছে, আগামী বছরের জুন পর্যন্ত গাজার এক লাখ ৩২ হাজার শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। অপুষ্টির চিকিৎসা করা অর্ধেকের বেশি গর্ভবতী নারী এবং প্রসূতি মা। বলা যায়, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ভয়ংকর গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন মারাত্মক অপুষ্টির শিকার, যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ চিত্র। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক মেডেলিন ম্যাকগিভার্ন বলেছেন, শিশুরা যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার চেয়ে মৃত্যু সহজ। জাতিসংঘের চারটি সংস্থা এফএও, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও ডব্লিউএইচও গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাগুলো গাজায় অবাধে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছে যেন ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে মৃত্যু কমানো যায়। সংস্থাগুলো জানায়, যেকোনো মূল্যে দুর্ভিক্ষ থামাতে হবে। তারা গাজা সিটিতে সামরিক অভিযান জোরদারের হুমকির বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে। আর জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক বলেছেন, আমরা এই পরিস্থিতিকে দায়মুক্তি দিয়ে চলতে দিতে পারি না। যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ক্ষুধা ব্যবহার করা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তিনি মনে করেন, অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি, সমস্ত জিম্মিদের অবিলম্বে মুক্তি এবং গাজায় নিরবচ্ছিন্ন মানবিক প্রবেশাধিকার প্রয়োজন।
অতি সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি স্বস্তির পথ খুঁজে পেলেও ফিলিস্তিনের গাজায় এখনও ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ চলছে। আজ (২৩ আগস্ট) এই সম্পাদকীয় লেখার সময় সর্বশেষ তথ্য মতে, ৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২৫১ জন আহত হয়েছে। শুধু গাজা সিটিতেই প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ জন। ইসরায়েল সেখানে আরও বৃহত্তর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আভাস মিলছে। তার মানে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইরাক-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালীনও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ হয়নি। আমরা মনে করি, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ না হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আরও ভাবতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো এই মানবিক সমস্যাটি সমাধানে সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন। বিশ্বশান্তির প্রশ্নে সব পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এই ধরনের নির্মমতা যেন আর কোনো দেশকে, কোন জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ না করে। ইসরায়েলের এই আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ হোক। আমরা চাই, দ্বিরাষ্ট্রীক সমাধানের আলোকে স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসুক।