মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৯ এএম
গণপিটুনি একটি শব্দ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য কান্না, রক্ত আর অমানবিকতার চিত্র। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা এতটাই বেড়েছে যে, সামান্য গুজব বা সন্দেহই মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। চোর, ডাকাত কিংবা শিশু অপহরণকারীর অভিযোগ উঠলেই উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, প্রায়ই দেখা যায় সেই মানুষটি আসল অপরাধী নয়, বরং নির্দোষ একজন অসহায়। গণপিটুনি কেবল একজনের মৃত্যু নয়, এটি পুরো সমাজের মানবিকতা ও ন্যায়বোধের মৃত্যু। যখন একদল মানুষ মিলে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করে, তখন সেখানে বিচার নেই, যুক্তি নেই, আছে কেবল আবেগ, রাগ আর হিংস্রতা। এতে প্রকৃত অপরাধী অনেক সময় পার পেয়ে যায়, অথচ নির্দোষ কেউ অকালে প্রাণ হারায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর দেশে অগণিত মানুষ গণপিটুনির শিকার হন। এর মধ্যে অনেকের জীবনই চলে যায় কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও শহরের প্রান্তিক এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। গুজবÑ বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারÑ এই ঘটনার অন্যতম কারণ। কখনও শিশু চুরির গুজব, কখনও ডাকাত প্রবেশের আতঙ্ক মুহূর্তেই মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তোলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণপিটুনির পেছনে জনগণের আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক সময় অপরাধী ধরা পড়লেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা-মোকদ্দমা শেষ হয় না। আবার প্রভাবশালী অপরাধীরা শাস্তি থেকে বেঁচে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের পথ বেছে নেয়। কিন্তু এতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে অপরাধ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, গণপিটুনি একটি ভয়াবহ অপরাধ, যা কখনও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। অপরাধী হলে তাকে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দিতে হবে। অপরাধী নয়, এমন কেউ যদি গণপিটুনির শিকার হয়, তবে সেটি শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই কলঙ্কজনক ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা এ সমস্যার সমাধানে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রথমত, অপরাধের অভিযোগ উঠলে দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে গুজবে মানুষ বিভ্রান্ত না হয়। পাশাপাশি জনগণকে বোঝাতে হবে যে বিচার করার দায়িত্ব আদালতের, জনগণের নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপিটুনি বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। যারা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা ও বিচার কার্যকর করতে হবে। তবেই জনগণ বুঝবে যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ।
সচেতন মহল মনে করে, গণপিটুনি কোনো সমাজে স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, নিরপরাধ মানুষকে প্রাণ দিতে বাধ্য করে। তাই এ প্রবণতা রোধে রাষ্ট্র, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জনগণকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। সভ্য সমাজে ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ হলো আইনকে মান্য করা ও মানবিকতা রক্ষা করা।