মোজাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩৪ এএম
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন হবে শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মূর্ত প্রতীক। হবে মর্যাদা, নীতিনিষ্ঠা আর গণতন্ত্রের প্রতীক। যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তাÑ সবাই এক হয়ে সিদ্ধান্ত হবে ন্যায়ভিত্তিক, কাজ হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং সকল সমস্যার সমাধান আসবে সুষ্ঠুভাবে। কিন্তু এখন সে ধারণা কেবলই স্বপ্ন। বর্তমান বাস্তবতায়, প্রশাসনিক ভবন আসলে এক ধরনের নাট্যশালা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনÑ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল কেন্দ্র; শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সেখান থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই নিয়ন্ত্রিত হবে। সেখানে নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীবান্ধব নীতি-নৈতিকতা, নতুন আইন, নতুন সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ঠিক রাখা, কর্মপরিকল্পনা করা, দায়িত্ব বণ্টন, জবাবদিহিতা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীবান্ধব একাডেমিক ক্যালেন্ডার, শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়ার গুরুত্ব দেওয়া, ভর্তি নীতিমালা, পরীক্ষার নীতিমালা, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ, বদলি, ছুটি, প্রমোশন ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করা। আবার বাজেট তৈরি, অনুমোদন, বিল ভেরিফিকেশন, বেতন-ভাতা প্রদান করা।
শিক্ষার্থীদের আবাসন নীতিমালা, বৃত্তি প্রদান, ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, বোর্ড অব গভার্নরস ইত্যাদি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করাই প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি পাই? আদৌও কি এরকম প্রশাসনিক ভবন আমরা দেখছি। এরকম প্রশাসনিক ভবন যেন আমাদের কাছে স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন যেন প্রহসন ভবনে রূপ নিয়েছে। প্রহসন হলো অবাস্তব কিছু করা, নাটক, তামাশা, হাস্যকর কিছু। ঠিক তেমনি এখানে চলে সেই প্রহসন। দায়িত্বের নামে দায়িত্ব অবহেলা, লোক দেখানো কাজ করা, ফাঁকি দেওয়া, নাটক, দায়িত্বহীনতা, কর্তব্য পালনে অনীহা, দুর্নীতি করা, লুট করা, ফটোসেশন, দায় এড়ানো ইত্যাদি।
বর্তমান সময়ে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন প্রহসনের সবচেয়ে পাকাপোক্ত মঞ্চ। প্রতিনিয়ত সভা-মিটিং হয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। যেকোনো ঘটনার তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু রিপোর্ট আসে না। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসভিত্তিক অনেক সমস্যা, যেমনÑ সেশনজট, নেই পর্যাপ্ত গবেষণার সরঞ্জাম, নেই পর্যাপ্ত আবাসন। হলগুলোতে অত্যন্ত নিম্নমানের অস্বাস্থ্যকর খাবার, থাকার সমস্যা, বিদ্যুৎ সংযোগের সমস্যা, ইন্টারনেট সমস্যা, নেই পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা। এ ছাড়া হল অফিসে নেই কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়মিত প্রবেশ, চারদিকে জঙ্গলে পরিপূর্ণ, নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, ভাঙা রাস্তা, জলাবদ্ধতা। ক্যাম্পাসের ভাঙা বাসে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত, লাইব্রেরিতে নেই পর্যাপ্ত পড়াশোনার সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য নেই সরঞ্জাম। শুধু সমস্যা আর সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানের জন্যই প্রশাসনিক ভবনে প্রতিনিয়ত সভা হয় কিন্তু সমাধান কোথায় আর হয় না! এসব সমাধানের নিয়োজিত ব্যক্তি আছে, পর্যাপ্ত বাজেট আছে তবুও সমাধান হয় না। কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী যদি নিরাপত্তার অভাবে ক্যাম্পাসে কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে সেটি একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এর দ্বায় কে নেবে। এমন ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যায়? কিছু ফটোসেশন, শোকবার্তা, তদন্ত কমিটির নাম ঘোষণাÑ তারপর নিস্তব্ধতা। কোনো জবাবদিহিতা নেই, নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। এটা কি প্রশাসন? আর রাজনীতির কথা না বললেই নয়। বর্তমানে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয়েছে রাজনীতির মঞ্চে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই রাজনীতি শেখায় সকল নীতি-নৈতিকতা বর্জন করে সত্য ঢেকে রাখা, মিথ্যা নিয়ে আসা, অন্যের ওপর দোষ চাপানো, অন্যায় করা, অপবাদ দেওয়া, ক্ষমতা দেখানো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে খেলা করা, তামাশা করা। যা হিংসাত্মক রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা, সেখানে তিনি হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি। শিক্ষক নিয়োগ, সিন্ডিকেটে প্রতিনিধিত্বÑ সবকিছুতেই চলছে পক্ষপাতিত্ব, দলীয় আনুগত্যের মূল্যায়ন। যেখানে উপাচার্য নিজেই নোংরা রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সেখানে অন্য শিক্ষক বা কর্মকর্তা বা শিক্ষার্থীদের কথা আর কি বলার আছে? বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ শুধু কাগজে-কলমে, খাতার পাতায়। যেখানে লিখে রাখে সেখানেই ক্লোজ। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
আমরা ভুলেই গেছি বিশ্ববিদ্যালয় কী! বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী কেন আসে! আমরা এখন জানি বিশ্ববিদ্যালয় হলো দেশের নোংরা রাজনীতির উপযুক্ত স্থান। যেখানে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, রাজনীতি সবকিছু হয়, হয় না শুধু জ্ঞানচর্চা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্র, মুক্তচিন্তার জাগরণভূমি। অথচ এই স্থানে চলে প্রশাসনের নামে স্বেচ্ছাচার, দায়িত্বহীনতা আর দলাদলি। এভাবে চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া আর কী হতে পারে?