আইন সংশোধন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১১:২১ এএম
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত হতে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। ফলে কর্তৃত্ব হারাতে যাচ্ছেন ব্যাংকগুলোর মালিকানাধীন প্রভাবশালী পরিবারগুলো। এই লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মালিকানার ক্ষেত্রে পারিবারিক ক্ষমতা খর্বের পাশাপাশি অর্ধেকই রাখা হচ্ছে স্বতন্ত্র পরিচালক। প্রস্তাবিত এই খসড়ায় ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশও রয়েছে। ঋণখেলাপির নীতিতেও বেশকিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন এই সংশোধনীতে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ চিহ্নিত করার বিধানটি বাতিলসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনের পরিবর্তনের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র উল্লেখ করে ২১ আগস্ট আমাদের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ব্যাংকে পারিবারিক ক্ষমতা কমছে’Ñ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন করেছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিগগির সংশোধিত আইন অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে। বিগত সরকারের সময়ে তিনটি নির্বাচনের আগে ব্যাংক কোম্পানি আইনে নানা শিথিলতা আনা হয়েছিল। সংশোধিত আইনে যার অনেক কিছুই বাদ যাচ্ছে। আমরা মনে করি, আইনটি কার্যকর হলে পরিচালকদের অনৈতিক ক্ষমতা কমে আসবে এবং বোর্ডের গঠন হবে স্বচ্ছ এবং ভারসাম্যমূলক। উদ্যোগটি সাধুবাদযোগ্য, আইনটি দ্রুত কার্যকরের প্রত্যাশা করছি।
আরও জানা যায়, পরিবর্তনগুলো মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য। ২০২২ সালে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত ছিল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক প্রভাব কমানো এবং পরিচালকদের মেয়াদ সীমিত করা। ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময় নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাংক কোম্পানি আইনে বেশকিছু শিথিলতা আনা হয়েছিল। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকা করা অনেক জটিল ও বাস্তবতাবিবর্জিত বিবেচনায় এবার আইনের প্রস্তাবিত সংশোধন থেকে এ ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। গ্রুপভুক্ত এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে আরেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার বিধানও বাদ দেওয়া হচ্ছে। পর্ষদে পারিবারিক প্রভাব কমাতে পরিচালক সংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ ২০ জন থেকে ১৫ জন করা হচ্ছে, যার অন্তত ৮ জন হবেন স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্য থেকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রস্তাব থাকছে। পরিচালক পদের মেয়াদ ১২ বছর থেকে ৬ বছরে নামিয়ে আনা হচ্ছে। এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালকের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনটি নির্বাচনের আগে ব্যাংক কোম্পানি আইনে নানা শিথিলতা আনা হয়। সংশোধিত আইনে পরিবারের সংজ্ঞার আওতা বাড়ছে। স্ত্রী, স্বামী, পিতা, মাতা, সন্তান, ভাই, বোন ছাড়াও শ্বশুরপক্ষ, ভাই বা বোনের স্ত্রী বা স্বামীপক্ষও পরিবার হিসেবে গণ্য হবে। একই পরিবার, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বিধান থাকছে। তবে ব্যাংকের নীতি নির্ধারণে ৫ শতাংশের বেশি ভোটিং পাওয়ার থাকবে না।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দুর্নীতিসহ নানামুখী সংকট ব্যাংক খাতে দুরারোগ্য ব্যাধির রূপ নিয়েছিল। ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট ও অর্থ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বেশিরভাগ ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়েছিল। আজকে দেশের ব্যাংকগুলোর দৈন্যদশা তথা অর্থসংকটের জন্য দায়ী বিগত সরকার। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে এগুলোর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকগুলো তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। এসব ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারাও। বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি। ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ছে না। কারণ খেলাপি ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপও নিতে পারছে না। সহজ করে বললে, লুটপাটে ঋণখেলাপি হওয়ায় কঠিন বাস্তবতার সামনে ব্যাংকগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত না করার সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন প্রশাসনিক জটিলতা কমাবে, অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার সুযোগও সীমিত করবে।
আমরা মনে করি, ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার কথা চিন্তা করে এরকম একটা আইনের প্রয়োজন ছিল। তবে এটা বাস্তবায়ন করতে জরুরি সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা। আইনের অপব্যবহার যাতে না হয় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে হবে। এ কথা সত্য যে, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্সগুলোর নেওয়া নানা পদক্ষেপের ফলে সুশাসন ফিরতে শুরু করেছে। তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে। টাকা পাচার ও লুটপাট বন্ধ হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। আসলে ব্যাংকিং খাত কেবল একটি দেশের অর্থনীতিই নয়, এটি দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও জনগণের আস্থা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে। এ কারণে কোনো দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় ব্যাংকিং খাতকে। এটা মানতেই হবে, একটা সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক এই উল্লিখিত সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা চাই, এই সংশোধনীর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও সুশৃঙ্খল ব্যাংক খাত উপহার দেওয়া হোক। বিগত সময়ে ব্যাংক খাতে পারিবারিক যে নৈরাজ্য দৃশ্যমান ছিল তার চির অবসান জরুরি।