× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৪ এএম

ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র

আমরা যারা অর্থনীতি বা বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করেছি, তাদের উন্নয়ন অর্থনীতি বা ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স নামের একটি বিষয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পাঠ্যসূচির মধ্যে একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব ছিল, তা হচ্ছে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র। এই তত্ত্বটি বেশ গুরুত্ত্ব দিয়ে পড়ানো হতো এবং প্রায় প্রতিবছরই প্রশ্নপত্রে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের ওপর একটা প্রশ্ন থাকত। ফলে আমরাও বেশ মনোযোগ দিয়ে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের বিষয়টি পড়েছি। পড়েছি বললে ভুল বলা হবে। মূলত না বুঝেই মুখস্থ করেছি, যাতে পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারি। ছাত্রজীবনে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পড়ানো হলেও, বিষয়টি সেভাবে বুঝতে পারিনি। ছাত্রজীবন শেষ করে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করলাম, তখন এই বিষয় নিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করে এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। বিষয়টি যে খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি তেমন দাবি করা না গেলেও ধারণাটা অন্তত পেয়েছি। 

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র মূলত এমন একটি অবস্থা, যা দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে থাকার মতো। যে দেশ বা জাতি দরিদ্র, তাদের সঞ্চয় বা মূলধন থাকে না বা খুবই অল্প পরিমাণে থাকে। আর এই সঞ্চয় বা মূলধনের অভাবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয় না। বিনিয়োগের অভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হয় না, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় না। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না পাওয়ায় সামষ্টিক চাহিদাও বৃদ্ধি পায় না। আবার চাহিদা বৃদ্ধি না পাওয়ায়, বিনিয়োগও বৃদ্ধি পায় না। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে স্বল্প উপার্জন বা সঞ্চয়ের কারণে, স্বল্প বিনিয়োগ। স্বল্প বিনিয়োগের কারণে স্বল্প কর্মসংস্থান, যার কারণে স্বল্প চাহিদা এবং অবশেষে স্বল্প চাহিদার কারণে আবার সেই স্বল্প বিনিয়োগ। স্বল্প বিনিয়োগের কারণে স্বল্প উপার্জন বা সঞ্চয়, যা অপর্যাপ্ত মূলধন তৈরি করে। এই স্বল্পের চক্রে অর্থনীতির সবকিছু আটকে থাকাকেই উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। 

এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র সম্পর্কে জানতে যেয়ে উন্নত বিশ্বের একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের লেখা পড়েছিলাম। পাঠকরা ক্ষমা করবেন কেননা লেখকের নামটা স্মরণ করতে পারছি না, কারণ অনেক আগে লেখাটা পড়েছিলাম। সেই অর্থনীতিবিদ তার লেখার স্বার্থে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ ভ্রমণ করেছেন। সেসব দেশের অর্থনীতি এবং দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন। সেই উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ তার লেখার এক স্থানে উল্লেখ করেছেন এমনভাবেÑ ‘তৃতীয় বিশ্বের মানুষ গরিব, কারণ তারা গরিব’। গরিব মানুষের আয়-উপার্জন কম। ফলে তারা ছেলেমেয়েদেরকে সুশিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। স্বল্প উপার্জনের কারণে থাকে না কোনো সঞ্চয় বা বিনিয়োগযোগ্য অর্থ। ফলে সংসারে দরিদ্রতা লেগেই থাকে এবং সেই সঙ্গে থাকে অপুষ্টি এবং অশিক্ষা। এই দরিদ্র পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরাও বাপ-দাদার মতো স্বল্প উপার্জনের কাজে নিয়োজিত হয়। ফলে গরিব ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে তারাও গরিব থেকে যায়। এ কারণেই সেই লেখক মন্তব্য করেছেন যে তৃতীয় বিশ্বের মানুষ গরিব, কারণ তারা গরিব। 

গত শতাব্দীর শেষের দিকে, বিশেষ করে সত্তর এবং আশির দশকে এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। কেননা সেই সময় উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে ছিল। আর সেসব দেশকে এই দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার চেষ্টার কমতি ছিল না। বিভিন্ন ঋণ সুবিধা প্রদান এবং এই সুবিধার অন্তরালে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের মাধ্যমে বেশিরভাগ ঋণের অর্থ বের করে নিয়ে অনেক বিদেশি বিশেষজ্ঞকে বড়লোক বানানোর চেষ্টাও অনেক হয়েছে। এই ঋণ সুবিধার মাধ্যমে কিছু নামমাত্র অবকাঠামো গড়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু এর অন্তরালে দুর্নীতিও হয়েছে যথেষ্ট। বলা যেতে পারে যে, আজ অনেক উন্নয়নশীল দেশে যে বিশাল বিশাল দুর্নীতির ঘটনা ঘটে, তার সূত্রপাত কিন্তু সেই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋণ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমেই হয়েছে। যাহোক পরবর্তীতে অনেক উন্নয়নশীল দেশই এই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। কিছু দেশ তো মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে গেছে, অনেক দেশ স্বল্প উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। অনেক দেশ অবস্থান পরিবর্তন করতে না পেরে এখনও স্বল্পোন্নত দেশের অবস্থানে থাকলেও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রটা ভাঙতে শুরু করেছে। ফলে একসময়ের উন্নয়ন অর্থনীতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ধারণাটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। 

এখন আর অর্থনীতির এই তত্ত্বটি সেভাবে আলোচনাই হয় না। এমনকি উন্নত বিশ্ব, যারা আগে অর্থনীতির এই তত্ত্বটি নিয়ে বেশ উচ্চস্বরে কথা বলেছে, তারাও এখন আর এ বিষয়ে কিছু বলে না। উন্নত বিশ্বের মিডিয়া, অর্থনীতিবিদ এবং থিংকট্যাংক, কেউই আর এই বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আলোচনা করে না। তবে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র আলোচনা থেকে পিছনে পরে গেলেও, আরেকটি দুষ্টচক্র এখন আলচনায় চলে এসেছে, সেটি হচ্ছে ‘ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র’। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ছিল উন্নয়নশীল বিশ্বের বিষয়, আর ‘ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র’ হচ্ছে উন্নত বিশ্বের বিষয়। মূলত ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ‘ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র’। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে যে ধনী, সে আরও বেশি ধনী হবে। যার বেশি সম্পদ আছে, সেই আরও বেশি সম্পদের মালিক হবে। 

বর্তমান অর্থনীতির কাঠামোই এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে বিত্তশীলদের আরও বেশি বিত্তবান হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে আছে। উন্নত বিশ্বে যার একশ বিলিয়ন ডলার আছে, সে যদি দশ শতাংশ সুদে জমা রাখে, বছরে তার দশ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে। এখান থেকে যদি এক বিলিয়ন ডলার নিজের জন্য খরচ করে, তাহলেও এক বছর পর তার সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে একশ ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এভাবে পাঁচ বছরে তার সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দুইশ বিলিয়ন ডলারে এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে চারশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ একসময়ের একশ বিলিয়ন ডলারের মালিক মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে চারশ বিলিয়ন ডলারের মালিক বনে যাবে। মার্ক জাকারবাগ, ইলন মাস্ক, ওয়ারেন বাফেটের মতো বিশ্বের সেরা ধনি ব্যক্তিরা এভাবেই শত শত বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছেন। পক্ষান্তরে যার মাত্র দশ লাখ ডলার আছে, সে একই সুদের হারে বিনিয়োগ করে বছরে উপার্জন করতে পারবে মাত্র এক লাখ ডলার। অথচ তার জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন হবে দেড় লাখ ডলার। ফলে দেখা যাবে এক বছর পর দশ লাখ ডলার হ্রাস পেয়ে ৯ লাখ পঞ্চাশ হাজার ডলারে নেমে এসেছে। এভাবে দশ বছর পর সেই ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে পাঁচ লাখ ডলারে নেমে আসবে। অর্থাৎ একসময়ের দশ লাখ ডলারের মালিক মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে পাঁচ লাখ ডলারের মালিকে নেমে আসবে। 

বিষয়টি নিয়ে যে একেবারে আলোচনা হচ্ছে না তেমন নয়। আলোচনা ঠিকই চলছে, তবে ‘ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র’ হিসেবে আলোচনা না হয়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আলোচনা চলছে। অনেকে এই অবস্থাকে বলার চেষ্টা করেছেন যে বর্তমান অর্থব্যবস্থায় ধনী আরও ধনী হচ্ছে এবং গরিব আরও গরিব হচ্ছে। আমাদের দেশে ‘ধনীর আরও ধনী হওয়া এবং গরিবের আরও গরিব হওয়ার’ বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। আমাদের চতুর্দিকে দৃষ্টি দিলে এই অবস্থাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু উন্নত বিশ্বে বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে আলোচনা হয়ে থাকে। আজ থেকে প্রায় বিশ/পঁচিশ বছর আগে উন্নত বিশ্বের আর্থিক অবস্থা ছিল ‘পাঁচ শতাংশ বনাম পঁচানব্বই শতাংশ’-এর মতো। এর অর্থ হচ্ছেÑ পাঁচ শতাংশ মানুষের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ ছিল, তার সমপরিমাণ সম্পদ ছিল বাকি পঁচানব্বই শতাংশ মানুষের হাতে। এর পনেরো বছর পরে, অর্থাৎ মাত্র দশ বছর আগে এই সমীকরণ এসে দাঁড়ায় ‘এক শতাংশ বনাম নিরানব্বই শতাংশ’। অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের আর্থ-সামাজিক কাঠামো এমন দাঁড়িয়েছিল যেখানে নিরানব্বই শতাংশ মানুষের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ, তা মাত্র এক শতাংশ ধনী মানুষের হাতে আছে। 

অবস্থা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যখন ধনাঢ্যের দুষ্টচক্রের সমীকরণটা দাঁড়াবে শূন্য দশমিক এক-শতাংশ বনাম নিরানব্বই দশমিক ৯ শতাংশ (০.১% বনাম ৯৯.৯%)। অর্থাৎ ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে আর্থ-সামাজিক কাঠামো এমন হবে যেখানে মাত্র ০.১% ধনী মানুষের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার চেয়ে কম পরিমাণ সম্পদ থাকবে ৯৯.৯% মানুষের কাছে। ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র সমাজে ব্যাপক আকারে প্রসারিত হলেও, বিষয়টি নিয়ে যেভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করার বা সমালোচনা হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র নিয়ে যেভাবে আলোচনা হয়েছে, সে তুলনায় ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র নিয়ে সেই মাত্রার আলোচনা নেই বললেই চলে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ধনাঢ্যের দুষ্টচক্র মূলত উন্নত বিশ্বের বিষয়। তাছাড়া যারা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির এই কুফল নিয়ে আলোচনা করবে, তারাও এই দুষ্টচক্রের পকেট বন্দি হয়ে গেছে। তবে অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। তাই এই অব্যবস্থা এক পর্যায়ে হয়তো বিস্ফোরিত হবে এবং তখন অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা কেউ বলতে পারবে না। আর সেই সময় পর্যন্ত ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি ধনাঢ্যের দুষ্টচক্রের মধ্যেই আটকে থাকবে।

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা