স্মরণ
এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১১:১০ এএম
শফিকুল গানি স্বপন
জন্মগ্রহণ করলে মানুষকে মরতেই হবেÑ এটাই চিরন্তন সত্য। এই সত্যকে অস্বীকার করা যায় না, করা সম্ভবও নয়। তবে এর মাঝেও কিছু মানুষ আছেন যারা মরণের পরও অমর হয়ে থাকেন। ইতিহাস তার সময়ের প্রয়োজনে সেই মানুষটিকে স্মরণ করে, স্মরণ করতে হয়। তেমনই একজন দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী, উদার গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল নেতা হচ্ছেন শফিকুল গানি স্বপন। মানুষের মাঝেই দোষ-গুণের সমাহার থাকবে। মহামানব ছাড়া কোনো মানুষই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না, থাকেনও না। শফিকুল গানি স্বপনও হয়তো বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন।
বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির ইতিহাসে এক ধ্রুবতারার নাম শফিকুল গানি স্বপন। তিনি ছিলেন আপাতমস্তক একজন ভদ্র, সব্যসাচী, বিনয়ী ও মেধাবী রাজনীতিবিদ। প্রতিহিংসার রাজনীতির যুগেও তিনি ছিলেন বিনয়ী রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাজনীতিক জীবনে শফিকুল গানি স্বপন তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছিলেন কঠোর সমালোচক, কিন্তু সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এমন কোন হীন শব্দ ব্যবহার করতেন না, যা রাজনৈতিক পরিবেশকে কুলষিত করে। যেই দৃষ্টান্ত আজকের যুগে রাজনীতিতেই ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তিনি জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। তিনি কখনও তার রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি যে রাজনীতি বিশ্বাস করতে তাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন। আমরা যখন শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক বিশ্বাসকে পদদলিত করতে কুণ্ঠিত হননি তিনি।
প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনার মেধাবী রাজনীতিক শফিকুল গানি স্বপন ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রংপুর জেলার আজকের নীলফামারী জেলার সদরে এদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম মরহুমা সাবেরা রহমান।
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মশিউর রহমান যাদু মিয়া মৃত্যুবরণ করলে শফিকুল গানি স্বপন রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সরাসরি আবির্ভূত হন। বাবার মৃত্যুতে শূন্য আসনের উপনির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর সদর ও নীলফামারীর ডোমার-ডিমলা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সাংবাদিক হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অসাধারণ দখল থাকার কারণে তিনি বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রের জগতে সাপ্তাহিক বঙ্গব্যাপী ও ফ্রাইডে প্রকাশ করেছিলেন। যা অল্প সময়ে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল।
ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া সংগঠন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্লাবকে সুসংগঠিত ও তার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শেষ মুহূর্তেও দেশপ্রেমিক শক্তির বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পুঞ্জিভূত দুঃখ-কষ্ট নিয়েই ২০০৯ সালের ২৩ আগস্ট আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে যান তিনি।
শফিকুল গানি স্বপন নাজহাত গানি শবনমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নাজহাত গানি বাংলাদেশ ন্যাপের উপদেষ্টা ছিলেন। তার স্ত্রী ২২ জুন ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের তিন সন্তান। জ্যেষ্ঠপুত্র জেবেল রহমান গানি, কন্যা ফারিয়া গানি ও কনিষ্ঠপুত্র ব্যারিস্টার মশিউর রহমান গানি। জ্যেষ্ঠপুত্র জেবেল রহমান গানি বর্তমানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান। কনিষ্ঠপুত্র ব্যারিস্টার মশিউর রহমান গানি একজন আইনজীবী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য।
ক্ষমতার ইতিহাস বড় নির্মম। ক্ষমতা পেলে মানুষ ভুলে যায় ইতিহাসের কথা। কাউকেই ভুলে গেলে চলবে না, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। বর্তমান রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে শফিকুল গানি স্বপনের মতো মেধাবী রাজনীতিকদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হচ্ছে। মনে রাখতে হবে ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানের পর কর্তৃত্ববাদী দখলদারত্বের পুরনো রাজনীতিতে আর ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেই সুযোগ তৈরি হলে সবাইকেই মাশুল দিতে হবে।
প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে শফিকুল গানি স্বপন ছিলেন আপসহীন। শফিকুল গানি স্বপন রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবে দেখেননি। মওলানা ভাসানীর আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ন্যাপ পুনর্গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার মেধাবী রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম আগামীতেও দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতাকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বহু সময় ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করছে। জনগণের দাবি ও ভাষা বোঝে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি খুঁজছে সাধারণ মানুষ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শাসকগোষ্ঠী দেশ শাসন করতে চায়, কিন্তু জনগণের ভাষা বুঝতে পারে না। ফলে তাদের পতন হয় নির্মমভাবে। সবাই ব্যস্ত হয়ে থাকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে, পরিণতি ভোগ করতে হয় নির্মম। যার ফলে জনগণের নেতা আজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সময় একজন শফিকুল গানি স্বপনের মতো নেতা বড্ডই প্রয়োজন ছিল।
সংগ্রামী রাজনীতিক শফিকুল গানি স্বপন। একজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, লেখক, সমাজচিন্তক, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আলোকবর্তিকা ও দেশমাতৃকার বীর সেনানী। শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি বেঁচে থাকবেন। প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শফিকুল গানি স্বপনের স্বপ্ন পথ দেখাবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে। শোষণমুক্তির স্বপ্নের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তিনি। তার মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক খুবই কম আছে। পরিচ্ছন্ন ও অসম্ভব ব্যক্তিত্ব বোধসম্পন্ন এ মানুষটি ছিলেন নির্লোভ ও সাহসী। স্পষ্ট বক্তা ছিলেন তিনি। আলোতে যা বলতেন, অন্ধকারে তা-ই বলতেন।
শফিকুল গানি স্বপন বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। এমন সত্য নির্মোহ, মনীষীদের মৃত্যু হয় না। আগামীকাল ২৩ আগস্ট তার ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই মৃত্যুদিনে তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।