রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৩ এএম
ফাইল ফটো
সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর ছিল এক অমূল্য সম্পদ। যা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করত। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম এই পর্যটন কেন্দ্রটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মূলত যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় মানুষ সহজে এই সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে এই অঞ্চলটিতে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মানুষ সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে আবার পাথর উত্তোলন করেছে। ফলে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরের এই প্রাকৃতিক লীলাভূমি পাথরের পরিবর্তে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কিভাবে অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে শতশত নৌকা নিয়ে প্রকাশ্যে এভাবে পাথর উত্তোলন করা হলো– সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে দিনের আলোতে প্রশাসনের চোখের সামনে এমন লুটপাট হলেও তেমন কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি প্রশাসনকে। যা সকলকে আরো হতাশ করেছে। স্বচ্ছ জলের নিচে থাকা সাদা পাথর দেখতে ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে আসতো। এখন যেহেতু এই পর্যটন কেন্দ্রটি মরুভূমির মতো রূপ নিয়েছে; সেহেতু এখানে আর কোন মানুষ দেখতে বা ঘুরতে আসবে না–এটাই স্বাভাবিক। এতে সরকার একদিকে যেমন রাজস্ব হারালো অন্যদিকে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবনযাত্রায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়লো।
এখন কথা হচ্ছে, ভোলাগঞ্জের এই পরিস্থিতি থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিতে পারলাম? দেশের মধ্যে আমাদের তো আরো অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোকে সুরক্ষা দিতে আমরা কতটুকু সচেতন হলাম? আমরা জানি, কক্সবাজার শুধু আমাদের দেশের নয়; পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। যেখানে নীল জলরাশি আর সমুদ্রের গর্জন শুনতে হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। কিন্তু বর্তমানে অবকাশ যাপনের অন্যতম এই পর্যটন কেন্দ্রের পরিবেশও কিছুটা হুমকির মুখে পড়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সৈকতের সবুজ বেষ্টনীর যেসব ঝাউ বাগান রয়েছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বালু উত্তোলনের ফলে নতুন নতুন খাদ তৈরি হচ্ছে। এতে সৈকতের সবুজ বেষ্টনীর নিচ থেকে বালু সরে গিয়ে ঝাউ গাছগুলো উপড়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর লুটপাটের ঘটনা আমাদের জন্য বড় একটি সর্তকবার্তা। এখান থেকে আমাদের পরবর্তী দিনে পর্যটনশিল্পের সুরক্ষায় শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। এই লুটপাট নিয়ে আমরা যদি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করি তাহলে কক্সবাজারের বালু নিয়েও আমাদের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে। দিন দিন এই অবৈধ কর্মকান্ড বাড়তে থাকলে সৈকতের পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে। এজন্য সৈকতের সার্বিক পরিবেশ ঠিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের মনিটরিং বাড়ানো প্রয়োজন। মাঝেমধ্যে অভিযান না চালিয়ে নিয়মিত এসব বালু খেকোদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিলে অনেকাংশে অবৈধ বালু উত্তোলন কমে আসবে।
বালু উত্তোলন সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক কাঠামোকে অনেকটা দুর্বল করে দেয়। এতে করে সমুদ্রের ঢেউ এবং স্রোতের আচরণে পরিবর্তন আসে। পাশাপাশি তীব্র ঢেউ এবং জলোচ্ছ্বাসের কারণে তীরের ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়। এরমধ্যে সৈকতে যে সুরক্ষাবলয় রয়েছে সেটি সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ পানির ঢেউ সরাসরি এসে আঘাত করে সুরক্ষাবলয়কে দুর্বল করে দেয়। এছাড়া সৈকতের তীরবর্তী যে ঝাউ গাছগুলোকে কেন্দ্র করে সৈকত গড়ে উঠেছে সেই ঝাউ গাছগুলোর অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে এখনই কাজ করতে হবে। না হলে শুধু পরিবেশই নয়; হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও বড় প্রভাব পড়বে। এজন্য দেশের পর্যটন শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে সরকারকে সমুদ্র সৈকত থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। তার জন্য যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রচলিত আইন অপর্যাপ্ত প্রতীয়মান হলে আইন সংশোধন কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। সরকার, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সমুদ্র সৈকতে কোন ধরনের কাজ করতে হলে অবশ্যই সেটি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সমুদ্র সৈকত ধ্বংস হলে শুধু কক্সবাজার নয়; সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা বিপন্ন হবে।