শিল্প ও বাণিজ্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫২ এএম
দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে নতুন বিনিয়োগ আসছে। এতে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মমুখী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বাড়ছে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ, যা শিল্পটির টিকে থাকার সম্ভাবনার সংকেত দিচ্ছে। জানা গেছে, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে চীনা কোম্পানি হান্ডা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপনের জন্য চার কোটি ডলারের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি করেছে হান্ডা। ভারত ও চীনের ওপর মার্কিন উচ্চশুল্কের কারণে বাংলাদেশের জন্য এই নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হলো। অধিক শুল্কারোপের কারণে দেশ দুটির তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিত করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ড। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিধি বিস্তৃতির নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় তৈরি পোশাকের বাড়তি ক্রয়াদেশ দিতে দরকষাকষি করছে অনেক মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, এই লক্ষ্যে চীনা বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে এবং ভারতীয় অনেক কোম্পানিও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চাইছে।
চীনের বিনিয়োগ আসার সংবাদটি খুবই ইতিবাচক। কারণ বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশটির ক্রেতারাও আসবে। তাতে আমাদের রপ্তানি বাড়বে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৩৪টি চীনা বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছে বেপজা। ইতোমধ্যে আটটি চীনা প্রতিষ্ঠান শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে বেপজার সঙ্গে চুক্তিও করেছে। তাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ কোটি ডলার। এসব কোম্পানি তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, হালকা প্রকৌশল পণ্য ইত্যাদি উৎপাদন করবে। অপর দিকে, মার্কিন ক্রয়াদেশ ধরে রাখার কৌশল হিসেবে ভারতের বড় রপ্তানিকারকরা তৈরি পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, উচ্চশুল্কের কারণে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশ ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তাতে ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা করছে দেশটি। ভারতের ওয়েলস্পান লিভিং, গোকলদাস এক্সপোর্টস, ইন্দো কাউন্ট ও ট্রাইডেন্টের মতো বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের মোট রপ্তানির ৪০-৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে করে থাকে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজারও হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ভারত চতুর্থ শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশও। ভারতের মূল প্রতিযোগীর অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই উচ্চশুল্কের কারণে ভারত থেকে স্থানান্তরিত ক্রয়াদেশ আমাদের দেশে আসতে পারে। ২০ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘পোশাক শিল্পে আসছে চীনা বিনিয়োগ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশের পোশাক শিল্প খাতের জন্য সংবাদগুলো নিঃসন্দেহে আশা-জাগানিয়া।
আমরা সবাই জানি, দেশে রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান পণ্য হলো তৈরি পোশাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে একক বড় বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। এ বছর বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ করে পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। যা অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী ও ব্যবসাবান্ধব। যে কারণে মার্কিন ক্রেতাসহ আগের স্থগিত ক্রয়াদেশও ফিরতে শুরু করেছে। এতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে যারা মার্কিন ক্রেতাদের কাজ করছেন। প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আরও বেশি ক্রয়াদেশ পাওয়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের পোশাক-প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে নানামুখী সংকটে এ সুযোগ হাতছাড়ার শঙ্কাও করছেন তারা। এ কথা সত্য যে, একসময় দেশের পোশাকশিল্প নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। সেসব সমস্যা মোকাবিলা করে বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তৈরি পোশাক শিল্পের এখন মূল্যমান প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক বাজারে শেয়ার ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগামীতে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা উচিত।
প্রকৃতপক্ষে সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ, স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহনশীলতাÑ এ তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে থাকে। বাংলাদেশ বিনিয়োগের অমিত সম্ভাবনাময় দেশÑ এ কথা যেমন ঠিক, আবার এদেশে বিদেশি বিনিয়োগে বাধাও যে অনেকÑ এ কথাও মানতে হবে। তবে ভরসা হলো, বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিকতা দৃশ্যমান আছে। নিকট অতীতে দেশে হয়ে গেল একটি বিনিয়োগ সম্মেলন। শ্রমিকের নিম্ন মজুরি হার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এদেশে বিনিয়োগের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি মার্কিন পাল্টা উচ্চশুল্ক কমাতে সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যও বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করেছে। এই শুল্ক হার আরও কমে আসার সম্ভাবনার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী। আমরা মনে করি, বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশি বিনিয়োগের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগবান্ধব ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আরও যেসব সমস্যা দৃশ্যমান সেগুলোর নিষ্পত্তি করা গেলে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বেÑ এটা বলাই বাহুল্য।