× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কৃষি খাত

কৃষক বাঁচাতে এখনই মূল্য কমিশন জরুরি

মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫১ এএম

কৃষক বাঁচাতে এখনই মূল্য কমিশন জরুরি

কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং দেশের কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও কার্যকর কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কÑ খানি বাংলাদেশ। গত ১৭ জুলাই রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক মিডিয়া ক্যাফে অনুষ্ঠানে এই দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে খানি ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রাণ)। কৃষকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে খানি মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং বিশ্লেষণ তুলে ধরেন, যেখানে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব বাস্তবতার মাঝে বিস্তর ফারাক চিহ্নিত করা হয়। 

কৃষি দেশের সর্ববৃহৎ কর্মসংস্থান খাত হলেও এখানকার উৎপাদকদের জন্য কোনো নির্ধারিত মূল্যনীতি নেই, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পণ্যের অস্থির বাজারমূল্য, উৎপাদন ব্যয় না ওঠা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনাকে বক্তারা এই সংকটের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এখানে উল্লেখ্য, সম্প্রতি মেহেরপুরের পেঁয়াজ চাষি সাইফুল শেখ মহাজনী ও এনজিও ‌ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এই কৃষক প্রতি মণ পেঁয়াজ ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করার পর যখন দেখলেন যে, সেই পেঁয়াজ ব্যাপারী দুই সপ্তাহ পর ২০০০ টাকা প্রতি মণ দরে বিক্রি করছেন, তখন তিনি অনায়াশেই কাতর হওয়ার কথা। 

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তা হলে দেখা যায় যে, প্রাচীন বাংলার সময়কাল থেকে রাজা-বাদশাদের আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও কৃষকের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ব্যবধান শুধু সেকালের শাসকগোষ্ঠী আর একালের ক্ষমতাধরদের নিপীড়ন। পুঁথিগত ইতিহাস বলছে চর্যাপদে উল্লেখ রয়েছে সমাজব্যবস্থার বৈষম্যের কথা যেমন উচ্চশ্রেণি ও নিম্নশ্রেণি (কৃষক, তাঁতী, জেলে, মাঝি, শিকারি)। তার পর সুলতানি আমলটা ছিল কৃষি-সমৃদ্ধ হলেও কৃষকের কোনো সমৃদ্ধি হয়নি; যার কারণ ছিল জমির অভাব, বর্গচাষিদেরও রাজস্ব দিতে হতো, ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর আদায়ে জুলুম চলত ইত্যাদি। ১৮৭৬ সালের মন্বন্তর, যা কোনো প্রাকৃতিক কারণে হয়নি বরং অব্যবস্থা ও রাজস্বনীতির নিপীড়নের কারণে হয়েছিল। যেখানে তখনকার সময়ে এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর বেশ কিছু সময়ে অধিকাংশ কৃষিজমি পতিত ছিল, যা ছিল খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ব্রিটিশ শাসকরা, পাঁচশালা, দশশালা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তসহ যত নীতিমালা গ্রহণ করে ছিল সবই ছিল কৃষকের স্বাথ পরিপন্থি। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর বৃহৎ জমি সরকারের অধীনে চলে আসে। আর যা কিছু অবশিষ্ট জমি বর্গাচাষিদের আওতায় চলে আসে। তারপর আসে ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধ যেখানে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর ৭১ শতাংশ ছিল কৃষক শ্রেণি থেকে আগত।

সময়ের আর্বতে একসময় যেখানে কৃষিকাজে নিয়োজিত হাউসহোল্ডের সংখ্যা ছিল ৯০ শতাংশ, যা বতর্মানে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৬ শতাংশে; যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। চলতি বছরের বাজেটে কৃষিশস্য খাতের অংশ মাত্র ৩.৪  শতাংশ, যা টাকার অংকে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ২২৪ কোটি। আবার কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। কৃষি খাতের নিম্নগামী প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না বিভিন্ন কারণে; যার একটি হলো মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধিবদ্ধ সংন্থা নেই; যার কারণেই কার্যকর কৃষিমূল্য কমিশন গঠনের প্রসঙ্গ এসেছে যা সময়ের দাবি। সরকার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে একটি কমিশন গঠনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। ভারতের ন্যূনতম সমর্থন মূল্য ব্যবস্থার আলোকে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ থাকলেও কৌশলগত পরিকল্পনা ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষকদের জন্য এ বছর ৩৭ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং ধান-চালের দাম নির্ধারণে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের জন্য শস্যবীমা চালু, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর আহ্বান জানান। তারা বলেন, কৃষিমূল্য কমিশন গঠন শুধু কৃষকদের আত্মহত্যা রোধ করবে না, বরং তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। তার মানে প্রাইস কমিশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে কমিশনে কৃষকদের সক্রিয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। 

এখন প্রশ্ন হলো, এই কমিশনের কাঠামো কী হবে? তা হলে বর্তমান অবস্থাটা পর্যলোচনার দাবি রাখে। দুটি বিষয় যেমন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও কৃষিপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৬৪ বর্তমানে প্রচলিত থাকলেও এদের কাযর্কারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; যা কোনোভাবেই বলা যাবে না যে, এগুলো সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করছে বা করতে পেরেছে। এখন সময়ের পরিক্রমায় একটি কমিশনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা হবে একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা, যেটি পণ্যের মূল্য ওঠানামা, কৃষিবাজার নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ, বাজার মেনিপুলেশন ও কৃষকের পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এর অংশ হিসেবে কমিশন বাজারের গতিবিধি বিশ্লেষণ, উৎপাদন খরচ বিবেচনা এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ (এমএসপি) নির্ণয় করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তা ছাড়াও কৃষি সাবসিডি, মূল্য সংযোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিও কমিশন দেখবে। এতে কৃষকরা একটি স্থিতিশীল বাজারমূল্য পাবে, যা তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক। এখন এই কমিশনের কাঠামো কী রূপ হবে, তা নিয়ে আলোচনা করা যায়। এ বিষয়ে ভারতের উদাহরণ থেকে বাংলাদেশ শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে। এই কমিশন ১৯৬৫ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ শুরু করে, যা বাংলাদেশ জন্মেরও ৬ বছর আগে। এই কমিশন ছয়জন সদস্য দ্বারা পরিচালিত যেমনÑ চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব, দাপ্তরিক সদস্য, দুইজন কৃষক সমস্য। এই কমিশন ভারতের ২২টি কৃষিপণ্যের ওপর ন্যূনতম মূল্য ঠিক করে দেয়, যার মধ্যে রয়েছে ৭টি শস্য (সিরিয়াল), ৫টি ডালজাতীয়, ৭টি তৈলজাতীয় ও ৩টি বাণিজ্যিক ফসল। তা হলে বাংলাদেশ কেন মাত্র ৩টি ফসল যেমন চাল, পাট ও গমের ওপর ন্যূনতম মূল্য নিরূপণ করে দেয়?

কৃষক যদি তার ফসলটা সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে তারা পরবর্তী সময়ে ন্যায্য দাম পাবেন। এর ফলে পরবর্তী সময়ে কৃষককে অন্যের হাতে চলে যেতে হবে না। এ জায়গাটায় আমার মনে হয় সরকারের একটা বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যাপার থাকবে। এ জায়গায় আরেকটু নজর দিতে হবে, যাতে প্রান্তিক চাষিরা পণ্যগুলো স্টোর করতে পারেন এবং পণ্যের ন্যায্য দামটা ঠিকমতো রাখতে পারেন। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে কেবল ম্যানুফ্যাকচারিং খাত কিংবা আরএমজির কথা উঠে এসেছে। কারণ এর মাধ্যমে ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে প্রতি বছর। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক কাঠামোর কথা বললে দেশের প্রকৃত নায়ক হচ্ছেন কৃষক। ঠিকমতো দাম পাক আর না পাক, তারাই দেশের প্রকৃত নায়ক। সমন্বিত একটি কৃষিনীতি প্রণয়নে কাজ করা উচিত সরকারের। 

আমরা সব জায়গায় শুনি, পরিবহন ও সংরক্ষণের অভাবে ২৫ শতাংশেরও বেশি শাকসবজি ও ফল নষ্ট হয়ে যায়। এটা বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতি। কৃষিপণ্য ঠিকমতো সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া চাই। বাংলাদেশের ফলের যে সম্ভাবনা সেটা আসলে আমরা কিছুই কাজে লাগাতে পারিনি। আমরা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৌসুমি ফল প্রক্রিয়াজাত করে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারি। এখন অনেক উদ্যোগ চালু হয়েছে। হিমাগার থেকে শুরু করে পরিবহন সব জায়গাতেই হাত দেওয়া হচ্ছেÑ এটাকে সাধুবাদ জানাই। সবশেষে কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ চেইনে যদি কৃষকের নিয়ন্ত্রণ আরেকটু বাড়ানো যায়, তাহলে তারা ন্যায্য দাম পেতে পারেন। এজন্য সংরক্ষণ, বিপণনে তাদের সামনে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে। আমরা চাই, আমাদের কৃষকরা যেন ন্যায্য দাম পান। একই সঙ্গে এটাও চাই, আমাদের ভোক্তারা ভালো পণ্য পাক।

  • কৃষি গবেষক ও অধ্যাপক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা