ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৫ এএম
একটা সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য ছিল কেবল ছাত্র-আন্দোলন তথা প্রতিবাদের কেন্দ্র। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এসে সেই ইতিহাস নতুনভাবে পরিচিতি পেল। এ কেবল ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ নয়, বরং রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝে জমে ওঠা দীর্ঘদিনের অনাস্থার বিরুদ্ধে এক তীব্র গণজোয়ার। ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রাম ও কুষ্টিয়াÑ সব জায়গায় রাস্তায় নামল ছাত্ররা। কাঁধে ব্যাগ, হাতে ব্যানার কিন্তু চোখে আগুন। দাবি ছিল একটাইÑ বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। প্রতিক্রিয়ায় সরকার করল গুলি, নিল রক্ত। আর এই রক্তের ছিটেফোঁটা মুছে গেল না বর্ষায়। ইতিহাস থেমে থাকেনি, বরং ছুটেছে দুরন্ত গতিতে, উন্মোচন করেছে ক্ষমতার পর্দার পেছনের নিষ্ঠুর চেহারা।
২০২৪ সালের মে মাসে হাইকোর্টের এক রায়ে পুনরায় প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে কোটা পদ্ধতির পুনর্বহাল ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য উপকারী মনে করা হয়, তেমনি অধিকাংশ সাধারণ ছাত্রের চোখে এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘সুবিধাভোগীদের রাজনীতি’। তাদের অভিযোগ, মেধা নয়Ñ পেছনের পরিচয়ই এখানে নিয়োগের ভিত্তি। রাস্তায় নামার আগে একটুও হিংসা ছিল না। শিক্ষার্থী মাত্রই বিশ্বাস করে ‘কলমই শক্তি’। কিন্তু যখন বারবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ‘কোটার’ কারণে বঞ্চিত হতে হয়, তখন রাস্তাই একমাত্র উপায় হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুপড়ি ক্যান্টিনÑ সবখানে একসুরে গর্জে ওঠে ছাত্রসমাজ। ‘সংবিধানে তো সমানাধিকার লেখা আছে!’Ñ এই একটাই যুক্তিতে চেপে বসে তারা। বাস্তবতা কিন্তু আরও নির্মম। শুধু চাকরির কোটা নয়, এটা ছিল নিয়োগব্যবস্থার রাজনৈতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
১৬ জুলাই, রংপুরÑ একজন ছাত্র, আবু সাঈদ। হঠাৎ গুলিতে নিহত হন। তিনি সেদিন কোনো আগ্রাসী ভঙ্গিতে ছিলেন না। তার হাতে ছিল একটি ছোট প্ল্যাকার্ড, যেখানে লেখা : ‘আমরা চাকরি চাই, মৃত্যুভয় না।’ মুহূর্তেই টিয়ার গ্যাস, গুলি, ছত্রভঙ্গের ডাক। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আবু সাঈদ এগিয়ে দাঁড়াচ্ছেনÑ এক পিকআপের সামনে, আর ঠিক তখনই গুলির শব্দ। মৃত্যুর সেই দৃশ্য, যেন ১৯৮৯ সালের চীনের তিয়ান আনমেন স্কোয়ারের বিখ্যাত ‘ট্যাংকম্যান’-এর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। অনেকেই বলেন, আবু সাঈদ হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ‘ট্যাংকম্যান’। সামাজিক মাধ্যমে রাতারাতি ভাইরাল হয় তার ছবি। পরদিন সকালেই দেশের অধিকাংশ ক্যাম্পাসে কালো পতাকা, মৌন মিছিল, শ্রদ্ধাÑ সব আয়োজন হয় সাঈদের নামে।
২০২৪ সালের ১৮-২৮ জুলাই ও ৪-৫ আগস্টে বাংলাদেশ সরকার পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং সামাজিক মাধ্যম- যা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নজিরবিহীন পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে জনসাধারণ, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীরা কার্যত ‘ডিজিটাল নির্বাসন’-এ নিক্ষিপ্ত হন। যে সময়টি ছিল সর্বোচ্চ তথ্য আদানপ্রদানের প্রয়োজন, ঠিক তখনই তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে সরকার মূলত জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়। এই নেটওয়ার্ক নিষেধাজ্ঞা শুধু প্রযুক্তিগতভাবে নয়, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়, যা জনমনে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সময় অসংখ্য নাগরিক নিখোঁজ, আটক বা আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তথ্যপ্রবাহের অভাবে তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঠাঁই পায়নি। সংবাদপত্রগুলো কাগজ ছাপাতে পারেনি, টেলিভিশন ছিল সরকারের প্রেস বিজ্ঞপ্তি নির্ভর এবং অনলাইন নিউজপোর্টাল বন্ধ হয়ে যায় একের পর এক। ফলে, এই ইন্টারনেট-নিরোধ ছিল এক নীরব গণনির্যাতনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া, যা প্রতিরোধের ভাষা কেড়ে নেয় জনগণের কাছ থেকে।
৪ আগস্ট ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে গণ-রক্তপাতের দিক থেকে ভয়াবহতম দিন হিসেবে পরিচিতি পায়। সেদিন সারা দেশে একযোগে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ, রাস্তায় নামে লক্ষাধিক মানুষ। শুধু ঢাকাতেই নিহত হন প্রায় ৯১ জন, যাদের মধ্যে ছিলেন পুলিশ সদস্যও। সরকারের একগুঁয়ে নির্যাতন, আটক ও গুলি চালানোর বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তা অবরোধ করে, প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে এবং স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসে। দিনভর সংঘর্ষের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সরকার ‘কারফিউ’ জারি করে এবং ‘শুট-অ্যাট-সাইট’ আদেশ জারি হয়, যা অনেককে পাকিস্তান আমলের গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘরছাড়া মানুষ আটকে পড়ে, খাদ্য ও পানি সংকট তৈরি হয়। সামরিক হেলিকপ্টার ও বুলেটপ্রুফ গাড়ি রাজপথে নেমে আসে, যেন রাষ্ট্রের নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। তারা শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের ৪৫ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’, ‘গণহত্যা’, ‘শিশু হত্যা’ এবং ‘সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ এনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয় সোশ্যাল মিডিয়ার লাইভ ভিডিও, পুলিশ রেডিওর টেপ এবং আক্রান্ত পরিবারের বিবৃতি। আদালতে অভিযোগ ওঠে যে, সরকার হাজারের বেশি মানুষকে বিচার-বহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। এই ট্রাইব্যুনাল জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এই আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া একদিকে দেশে আইনের শাসনের বার্তা দেয়, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সরকার-সমর্থিত সহিংসতার বিরুদ্ধে নজির স্থাপন করে।
আন্দোলনের সময়ে ও পরবর্তী দমন-পীড়নে দেশের প্রায় ১১ হাজার ৭০০ জন নাগরিক আটক হন, যার মধ্যে স্কুল ছাত্র, শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসক এবং গার্মেন্টস শ্রমিকও ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৮৭ বছরের বৃদ্ধা থেকে শুরু করে ১৩ বছরের কিশোর পর্যন্ত ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে ৯২ হাজার ৪৮৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদ আইনে মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের অনেককেই দিনের পর দিন কোনো অভিযোগ ছাড়াই রিমান্ডে রাখা হয়, আইনজীবী পাননি বা তাদের পরিবারকে জানানো হয়নি। এই বিচার-বহির্ভূত আটক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আইনজীবীদের প্রতিবাদ শুরু হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ‘গণবিচার’ শব্দটি ব্যবহার করতে বাধ্য হন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এটি ছিল রাজনৈতিক বিরোধীদের চুপ করিয়ে দেওয়ার কৌশলগত পদক্ষেপ, যার ফলে বাংলাদেশে আইনের শাসনের ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। রাজপথে তাদের প্রাণের বিনিময়ে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক চেতনার নতুন ধারা। এই তরুণেরা ফেসবুক ও টেলিগ্রাম গ্রুপে শুরু করে একটি ঐক্যবদ্ধ দল গঠনের আলোচনা। এর পরই গঠিত হয় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) যার মূলমন্ত্র : ‘আমরা জনগণের জন্য, দল নয়, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন।’ দলে ছিল হিন্দু, মুসলিম, উপজাতি, নারী ও প্রতিবন্ধী কোটার প্রতিনিধিত্ব। এ দল গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্বাচনে প্রো-রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতি এবং মানবাধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। সিএসপি মডেলে দল পরিচালিত হয়Ñ কেন্দ্রীয় নেতা নয়, বরং অঞ্চলভিত্তিক সমন্বয় কমিটি ও সুশীল সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে একটি সমান্তরাল কাঠামো তৈরি হয়। এরাই প্রস্তাব করেÑ অস্থায়ী সরকারের রোডম্যাপ, যা সরকার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
কেন এটি সফল বিপ্লব? যদিও এই বিপ্লবের তাৎক্ষণিক ফলাফল হিসেবে কোনো টেকসই আর্থিক সংস্কার দেখা যায়নি, রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে দেয়। দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসনের পতন, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের রাষ্ট্রে অংশগ্রহণÑ এই তিনটি অর্জন এই আন্দোলনকে ‘সফল’ হিসেবে চিহ্নিত করে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, তথ্য ফাঁস, গণবিচার এবং জনগণ কর্তৃক বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের সুনির্দিষ্ট সূচনাÑ এসবই ইঙ্গিত দেয় ভবিষ্যতের এক সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার। এ আন্দোলন বুঝিয়ে দেয়, পরিবর্তন রক্ত দিয়ে কিনতে হয় কিন্তু তার মূল্য অনন্ত হয় না, যদি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা থাকে জনগণের হাতে।
এ কেবল কোটা নয়, এ এক জাতিগত জেগে ওঠা! জুলাই-আগস্ট বিপ্লব যেন ছাত্রের রক্তে কাঁপল ‘দুর্গ’! খণ্ড-খণ্ড নয়, একাত্ম লড়াই। কোটা থেকে কোন্দল নয়, জেগে উঠল এক নতুন বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার প্রস্থানের মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায় শেষ হলেও, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন গল্প এখনও শুরু হয়নি। ইউনূসের নেতৃত্ব, অস্থায়ী সরকার, ছাত্রদের ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’Ñ সবই সূচনা, ফলাফল নয়। চোখ হারানো তরুণেরা এখন সমাজ বদলাতে চায়, চেতনায় নেতৃত্ব চায়, আর ‘তথ্যবিহীন’ যুগের পর চায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা। ইতিহাস হয়তো বলবেÑ এই আন্দোলন তৎকালীন বাস্তবতা পাল্টায়নি কিন্তু পাল্টে দিয়েছিল ভবিষ্যতের সংজ্ঞা। এখন প্রশ্ন একটাইÑ এই আলোর স্ফুলিঙ্গ, আগুন হবে তো?