নির্বাচন প্রস্তুতি
ফজলে মিনহাজ
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রধান উপদেষ্টা গত ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সে হিসাবে আগামী ডিসেম্বরের প্রথমার্ধেই নির্বাচন কমিশন ভোটের তফসিল ঘোষণা করবে এবং রমজান মাস শুরুর আগেই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হবে, এমন আশা করা যায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে পরবর্তী ছয় মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সময়।
নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণার মাধ্যমে একদিকে নির্বাচন প্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছে, অন্যদিকে জনমনে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আবেগ ও প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং তার ফলে জনমনে বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা ও অনাস্থা। বিশেষত, পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
নির্বাচন আয়োজন ও নির্বিঘ্নভাবে ভোটগ্রহণের জন্য পুলিশের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পুলিশ বাহিনী কি আজও মনোবল ফিরে পেয়েছে? জনমনে কি পুলিশ নিয়ে স্বস্তি ও আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে?
স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা পুলিশের ভূমিকা বারবার রাজনৈতিক প্রভাবে বিকৃত হয়েছে। প্রতিটি শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করেছে। ফলে জনগণের বন্ধু হওয়ার বদলে পুলিশের পরিচয় হয়ে উঠেছে শাসকের ‘ভ্যানগার্ড’।
পুলিশ বাহিনীকে স্বাধীন বলা যেমন যায় না, তেমনি এটিকে পুরোপুরি অদক্ষও বলা যাবে না। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দলীয় প্রভাবের কারণে তারা জনবিচ্ছিন্ন একটি প্রভাবিত বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। আর এ দায় শুধুই পুলিশের নয়, এটি শাসক শ্রেণি ও কিছু উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার সম্মিলিত দায়।
বিগত সরকারের সময় যেসব ঘটনা ঘটেছেÑ সাদা পোশাকে হয়রানি, বিনা পরোয়ানায় মধ্যরাতে মানুষ গুম, ক্রসফায়ার, বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মীদের দমন-পীড়ন, এমনকি জুলাই মাসের ‘গণহত্যা’Ñ এর সবই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট জনগণের আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছেÑ পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা এবং সরকারি সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে।
পুলিশের ভবিষ্যৎ রূপ কী হবে, সেটিই এখন সময়ের প্রশ্ন। রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি স্বাধীন, জবাবদিহিতামূলক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠন করা অতীব জরুরি। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা রয়েছে, ফলে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কতজন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক যুবক সাড়া দেবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এজন্য শুধু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলেই চলবে নাÑ তার আগেই পুলিশের কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কার দৃশ্যমান করতে হবে। যাতে তরুণদের মধ্যে আস্থা ফেরে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পুলিশের পেশাকে সম্মানের চোখে দেখে।
এ ছাড়াও পুলিশের অন্যান্য সহযোগী ইউনিটÑ যেমন নৌ-পুলিশ, বন্দর পুলিশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশকেও সমানভাবে দক্ষ, গতিশীল ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে হবে। দেশের বিভিন্ন অরাজকতার পেছনে পুলিশের মাঠপর্যায়ে অনুপস্থিতি ও নিষ্ক্রিয়তা বড় কারণ। তাই পুলিশকে উপেক্ষা করে নয় বরং তাদের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠন করেই রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। শেষ কথা হলোÑ পুলিশ যতই সমালোচিত হোক না কেন, এই বাহিনী ছাড়া রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব নয়। তবে সেই পুলিশের হতে হবে জনতার, নয় ক্ষমতার ভ্যানগার্ড।