খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা
ড. জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:২১ পিএম
গত অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের অর্থনীতি বেশ চাপের মধ্যে ছিল। মাঠে ও কলকারখানায় উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছিল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ক্রেতারা ছিল দিশাহারা। চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছিল অস্বাভাবিক গতিতে। সংসার চালাতে অনেকের ছিল ত্রাহি অবস্থা। ফলে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে অনেক মানুষ।
জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থা কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় নিমগ্ন অন্য চারটি দেশ নাইজেরিয়া, সুদান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও ইথিওপিয়া। সমীক্ষা পরিচালনায় অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলো- এফএও, ইফাদ, ডব্লিউএফপি, ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ। বৈশ্বিক খাদ্য সংকট নিয়ে করা ওই সমীক্ষা প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অব ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’ অনুসারে বাংলাদেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার। তারা সুষম খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে। দেশের দৃশ্যমান খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় জাতিসংঘের ওই সমীক্ষার ফলাফল আমাদের শঙ্কিত করে।
খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনটি শর্তের প্রথমটি খাদ্যের গড় প্রাপ্যতা, দ্বিতীয়টি খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবার অভিগম্যতা এবং তৃতীয়টি খাদ্যের পর্যাপ্ততা, সুষমতা ও নিরাপদতা। অনেকে এগুলোকে তিনটি ‘এ’ (অ্যাভেইলেবিলিটি, অ্যাকসেস ও অ্যাডিকুয়েসি) হিসেবে চিহ্নিত করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খরা ও বন্যায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে প্রয়োজনীয় প্রাপ্যতায় ঘাটতি ছিল। তবে ব্যাপক মাত্রায় চাল ও গম আমদানি করে (১৪ দশমিক ৩৭ লাখ টন চাল ও ৬২ দশমিক ৩৫ লাখ টন গম মোটÑ ৭৬ দশমিক ৭২ লাখ টন খাদ্যশস্য) মোট প্রাপ্যতা বৃদ্ধির প্রয়াস করা হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যশস্যে সবার অভিগম্যতা ছিল না। সরকারের গরিববান্ধব কর্মসূচির আওতা হ্রাসেও অভিগম্যতা হ্রাস পায়।
খাদ্যপ্রাপ্তিতে পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রে দেশে ঘাটতি আছে। সুষম খাদ্যের সরবরাহ সীমিত। প্রাপ্য খাদ্যের নিরাপদতা নিয়েও রয়েছে অনেক শঙ্কা। বর্তমান অর্থবছরের শুরুতে খাদ্যশস্যের মোট সরবরাহ অনেকটা ভালো বলেই প্রতীয়মান। গত বোরো মৌসুমে চালের মোট উৎপাদন ভালো হয়েছে। চাল ও গম মিলিয়ে ৩ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের মজুদ রয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার টন খাদ্যশস্য। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে খাদ্যশস্যের বাজার বর্তমানে অস্থির হয়ে উঠছে। তাতে খাদ্যের অভিগম্যতায় সাধারণ ভোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় সাম্প্রতিক ঘাটতি থাকার অন্যতম কারণ মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালের জুলাইতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সেটা ছিল গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তখন খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর গত নভেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। গত জুনে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়ে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশে। গত রবি মৌসুমে শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন পর্যাপ্ত হওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কয়েক মাস ধরে ক্রমাগত হারে নেমে আসে। তাতে সাধারণ মূল্যস্ফীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতিসম্প্রতি চালের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য; যেমন- মাছ, মাংস, সবজি ও পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধির শঙ্কা জেগেছে। গত জুলাইতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে। বাংলাদেশের মতো একটি কম গড় আয়ের দেশে এ মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি। এ হার ২-৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকা উচিত।
আমাদের দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় প্রভাব রাখে চাল ও মাছের মূল্যবৃদ্ধি। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে আমাদের খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চাল ও মাছ মিলিয়ে মোট ৮৩ শতাংশ অবদান রাখে। চাল অবদান রাখে ৫০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর মধ্যে মাঝারি চালের অবদান ২৫ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং মোটা চালের অবদান ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ, বাকিটা সরু চাল। অন্যদিকে মাছের ভূমিকা ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অতএব, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা খাদ্য মূল্যস্ফীতি দমনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জানা যায়, বর্তমানে চালের বাজারে যে অস্থিরতা চলছে তা সামাল দিতে প্রায় ৯ লাখ টন চাল আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে চার লাখ টন সরকারিভাবে এবং পাঁচ লাখ টন বেসরকারিভাবে আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারে এখন চালের দাম সাম্প্রতিক কালের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ সময় সরকারি পর্যায়ে চালের আমদানি বেশি হলে এবং তা খোলাবাজারে বিক্রি করা হলে অভ্যন্তরীণ চালের দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গত নভেম্বর-জুন পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতি ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে হ্রাস পেয়েছে সাধারণ মূল্যস্ফীতি। এর সঙ্গে দেশের মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে। চলতি জুলাই-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতিতেও সংকোচনমূলক ধারা অব্যাহত রয়েছে। তা ছাড়া টাকার নিম্নমুখী বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক বাজারে পণ্যমূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা মূল্যস্ফীতিকে অবদমিত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আগামী দিনগুলোয় উৎপাদন ভালো হলে এবং নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তথা সাধারণ মূল্যনীতি ৬-৭ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পায় মূলত সরবরাহ সংকটের কারণে। উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণেও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। এটিকে বলা হয়, উৎপাদন খরচতাড়িত মূল্যস্ফীতি। এর সঙ্গে অধুনা যুক্ত করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের লোভতাড়িত তথা অযাচিত মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশাজনিত মূল্যবৃদ্ধিকে। পণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস পেলে এবং বৈশ্বিক মুদ্রা সংকটের কারণে আমদানি কম হলে বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। প্রায় তিন বছর ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে উল্লিখিত কারণগুলো বিদ্যমান ছিল। এ সময় কৃষি উপকরণ, বিশেষ করে সার, শ্রমিক ও সেচের দাম লাগাতার বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়ার বৈপরীত্য বিঘ্নিত করেছে উৎপাদন, সৃষ্টি হয়েছে পণ্যের সরবরাহ সংকট। এ সুযোগে এক শ্রেণির লোভী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং অনৈতিক মুনাফা অর্জন থেকে লোভী ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সহজে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটা বড় কারণ উৎপাদনে অদক্ষতা। ফসলের কৃষি খাতে যেমন অদক্ষতার অনেক দৃষ্টান্ত আছে, শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতেও তার দৃষ্টান্ত কম নয়। দেশে মাছ, মাংস, ডিমের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। কিন্তু দাম চড়া। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে আমিষজাতীয় খাদ্যের দাম বেশি। অনেক সময় তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। তাতে সুষম খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ থেকে অনেক ভোক্তা থাকে বঞ্চিত। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া বাণিজ্যিকায়নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে ভোক্তাদের কাছে পণ্যসামগ্রী সহজলভ্য করা। কিন্তু সে উদ্দেশ্য অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে। তার প্রতিকারের জন্য উৎপাদনের অদক্ষতা দূর করতে হবে। তাতে প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে পণ্যমূল্য।
বাজারে অদক্ষতা দূর করা পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। আমাদের পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে অনেক মধ্যস্বত্বভোগী কাজ করছে। তাতে বাজারজাতকরণ খরচ ও মুনাফা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে খামার প্রান্তের মূল্যের সঙ্গে পণ্যসামগ্রীর ভোক্তামূল্যের মধ্যে ফারাক বেড়ে যাচ্ছে। এটা হ্রাস করা দরকার। এটা কমানোর জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে পণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং তা নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনা দরকার। উৎপাদনকারী কৃষকের সঙ্গে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য ‘কৃষকের বাজার’ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা দরকার। কৃষকদের জন্য বিপণন সমবায় গঠন করে তাদের সংগঠিত হতে সহায়তা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিপণন বিভাগের কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান করা উচিত। কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা রোধে সহায়ক হতে পারে। আমাদের অনেক কৃষিপণ্য অনিরাপদ বলে ধরে নেওয়া হয়। তার প্রধান কারণ বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার। শাকসবজির ক্ষেত্রে এর বিরুদ্ধে জনমত সোচ্চার হচ্ছে ক্রমেই। ফলমূলের ক্ষেত্রেও কৃত্রিমভাবে পরিপক্ব দেখানো এবং সংরক্ষণের সুবিধার্থে বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করতে শোনা যাচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অনিরাপদ খাদ্যসামগ্রী বাজারজাতের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
গত জুলাইতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে দশমিক ১৭ শতাংশ। চাল, সবজি, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন। দেশে খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি যে সমীক্ষালব্ধ ফলাফল প্রকাশ হয়েছে তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় মানুষের মৌলিক প্রয়োজন উপেক্ষিত থাকে। মানবিক জীবনবোধ অবহেলিত হয়। সাম্প্রতিক উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে খুবই কষ্টে আছে দেশের বহু দরিদ্র মানুষ। অনেকে কৃচ্ছ্রসাধন করছে, ক্ষুধাকে চেপে যাচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ দরকার। এ সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি এবং বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।