সিসা বার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১৬ পিএম
যেকোনো সমাজ ও দেশের জন্য মাদক এক ভয়াবহ অভিশাপ। মাদকের আসক্তি আমাদেরকে কোন অন্ধকারের অতলে তলিয়ে দিতে পারে তাও সবারই জানা। নেতিবাচক প্রচারণা এবং কুফল নিয়ে হরহামেশা আলোচনার পরও আমরা মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে মুক্ত নই। নানাভাবে, নানারূপে মাদক আমাদেরকে গ্রাস করছে। তরুণ ও যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। আইনত নিষিদ্ধ হলেও মাদক দুর্লভ নয়। আর চাহিদা থাকায় দেশের অভিজাত এলাকা তো বটেই, অলিগলিতেও এই বিধ্বংসী নেশাদ্রব্য মেলে। মাদকের উদ্বেগজনক বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামেও।
রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে গড়ে উঠছে সিসা বার। যা যুবসমাজকে উৎসাহিত করছে মাদকের প্রতি। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ‘সিসা বারের আড়ালে মাদকসেবীর মেলা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে। কারণ, এ ধরনের বার পরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ‘সিসা’ বা ‘হুক্কা’ সামাজিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ীও দেশে এ ধরনের বার পরিচালনা বৈধ নয়। অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী রাজধানীর গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকাতেই রয়েছে ৩০ থেকে ৪০টি সিসা বার। যেগুলোর তালিকা সব সংস্থার কাছেই আছে। তারপরও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধও হচ্ছে না। কেন? কারণ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দোহাই দিচ্ছে, তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বল্পতা রয়েছে। এজন্য তাদের পক্ষে ‘অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও অভিযান চালানো সম্ভব হয় না’। আমরা এ ধরনের মেকি কথায় দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার বিপক্ষে। কারণ লোকবল সংকটের অজুহাত দিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে মাদকের বিস্তার বন্ধ করা কঠিন হলেও, খোদ রাজধানীর অভিজাত এলাকায় অভিযান চালানো যাবে না, তা মেনে নেওয়া কঠিন। অথচ প্রকাশ্যে সিসা বারগুলো দিনের পর দিন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা মনে করি, শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরই নয় এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীরও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজধানীতে সিসা বারের আড়ালে ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের যে চিত্র উঠে এসেছে তা প্রকারান্তরে বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।
মাদকদ্রব্য কেনাবেচা ও সেবনকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ। আমরা যদি মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে না তুলতে পারি, তাহলে সমাজেও বাড়তে থাকবে অপরাধ প্রবণতা।
আমরা খুব বেশি মাদক উৎপাদনকারী দেশ না। তারপরও মাদকের ভয়াবহতার শিকার। কারণ, আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশই মাদক উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিকভাবে দেশগুলোর অবস্থান কাছাকাছি হওয়ায়, সীমান্ত পেরিয়ে সহজেই সেগুলো আমাদের এখানে প্রবেশ করছে। সীমান্তপথে মাদক যেন প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করার বিষয়েও কথাবার্তা কম হয়নি। কিন্তু সেসবের কোনোটিই যে যথাযথভাবে কাজ করছে না, তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না।
মাদক সেবনের আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি তো রয়েছেই। মাদকের কালো থাবার শিকার বিশেষত তরুণ সমাজ। যে পরিবারে মাদকাসক্ত ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, সে পরিবারের সুখ-শান্তিও হারিয়ে যায়। সামাজিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ে। তাই মাদকের বিস্তার রোধে সরকারকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর আরও গঠনমূলক উদ্যোগ নিতে হবে।
এ কথা তো স্পষ্ট যে, মাদকের নেশায় কম বয়সিদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। তরুণদের ভবিষ্যৎ মাদকের পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়ে যাক, তা কারওই কাম্য নয়। মাদকের কুফল এবং মাদক পাচারের শাস্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার পরও মাদকের প্রভাব ও মাদকের প্রতি যুবসমাজের আকর্ষণ কমেনি। বরং তা যেন দিনে দিনে বাড়ছে। এর পেছনে বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব, হতাশা, তাৎক্ষণিক আনন্দ লাভের মতো বিষয়গুলো জড়িয়ে রয়েছে। নিঃসঙ্গতা, হতাশা, একাকিত্বের মতো শব্দে ভর দিয়ে ভয়াবহ নেশাদ্রব্য উঠে আসছে যুবসমাজের হাতে। নেশা শুধু ব্যক্তির সম্ভাবনাময় জীবনই ধ্বংস করে না, তা পরিবার, সমাজ তথা সমগ্র জাতিকেই গ্রাস করে।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে নানা মহল থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ চাইলেই মাদক কারবার বন্ধ করতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবে তাদের সদিচ্ছা দেখা না যাওয়ার কথাই আলোচিত হয়েছে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের ঢেউকে মানুষ স্বাগত জানিয়েছে, ছাত্র-জনতার যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন সরকারের কাঁধে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সকলকেই ভূমিকা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মাদক কারবার থামাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগও জরুরি।
একসময় মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলে ক্রসফায়ার কালচার চালু হয়েছিল। তাতে অনেক লোকের জীবন গেলেও মাদকের বিষাক্ত ছোবলের বিস্তার ও ক্ষমতার মদদপুষ্ট ইয়াবা বদিদের দোর্দণ্ড প্রতাপ দেশবাসী দেখেছে। কিন্তু এমনটি তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আইনি শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। এজন্য প্রয়োজন যথোপযুক্ত দাওয়াই। যার মাধ্যমে মাদকের অপচ্ছায়া সরিয়ে সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠন সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন। মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক ও পারিবারিক প্রচেষ্টার পাশাপাাশি প্রতিটি পরিবারের উচিত তাদের সন্তানদের দিকে নজর রাখা। তাদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিনোদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি অভিভাবকদের ভূমিকা নিতে হবে।