বাজারদর
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:২৩ পিএম
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি যেন সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এখন কার্যত মজুদদার-মুনাফাখোরদের সিন্ডিকেটেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের গতি। কী গরিব, কী নিম্নবিত্ত, কী মধ্যবিত্তÑ সবার কাছেই এই মুহূর্তে সবচেয়ে ‘অস্বস্তি’র বিষয় নিত্যপণ্যের বাজারদর। প্রায় সকল বাজারে, যেকোনো পণ্যের দাম দরই ঊর্ধ্বমুখী এবং অসহনীয়। শুধু সবজিই নয়Ñ মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, চালসহ সকল নিত্যপণ্যের একই অবস্থা। বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। ডিমের দাম ডজনে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। শুধু তাই নয়, গত কয়েক মাস ধরে চালের দাম উচ্চ পর্যায়ে স্থির হয়ে আছে। মোটা চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকার ওপরে। মাঝারি মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ভালো মানের ব্র্যান্ডের চাল ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য নতুন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রূপক অর্থে অনেকে বলেনÑ বাজারে ‘আগুন’ লেগেছে। আর সেই আঁচ এসে সরাসরি লাগছে খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হেঁশেলে। এতে সাধারণ দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আয় বাড়েনি অথচ ব্যয়ের এই বৃদ্ধিতে চারদিকে যেন নীরব হাহাকার। সহজ করে বললেÑ গরিবের যেন আর বাঁচার পথ নেই! এতে প্রান্তিক পরিবারগুলো বাজেট সংকটে পড়েছে। অনেকেই বাজার থেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনে ঘরে ফিরছেন। ফলে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসছে। বাস্তবতা এমন যে, এই বাজারযুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে বহু পরিবার তাদের সন্তানদের জন্য কেনা পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে, খাদ্যের পরিমাণ এবং মানের সঙ্গে আপস করছেন অনেকটা বাধ্য হয়েই।
বাজারে পণ্যের সরবরাহ যে অনেকটা স্বাভাবিক তা বাজারের চিত্রই বলে দিচ্ছে। তারপরও বিক্রেতারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবহন ব্যয়বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিচ্ছেন। ক্রেতারা মনে করেন, এসবের আড়ালে রয়েছে মুনাফা বাড়ানোর প্রবণতা। কথায় বলে, ‘খলের ছলের অভাব হয় না’Ñ ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সব সময়ই কোনো না কোনো অজুহাত দাঁড় করান। উদ্দেশ্য যেকোনো উপায়ে দাম বাড়িয়ে রাখা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে বাজারে সমন্বিতভাবে দাম বাড়ানো হয়, যা ভোক্তার জন্য বড় চাপ। এ কথা সত্য যে, দেশে সাধারণত দ্রব্যমূল্য একবার বাড়লে তা কখনোই পূর্বের অবস্থায় ফেরে না। বরং বাড়তি মূল্যেই এক সময় অভ্যস্ত হতে হয়। পরবর্তীতে আবার যখন বাড়ানো হয়Ñ সেটাও কম বিড়ম্বনার নয়।নিত্যপণ্যের সেই অসহনীয় ক্রান্তিকাল এখন অতিক্রম করছে দেশবাসী।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। মাননীয় উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টরা যদি বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রতি একটু নজর দিতেন, তাহলে সীমিত আয়ের মানুষ একটু স্বস্তি পেতেন। আমরা মনে করি, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতা ঠেকাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মজুদদার, সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। জনগণকে স্বস্তি দিতে হবে।
লাগামহীন এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পেছনে বাজার সুশাসনের ঘাটতি হিসেবে দেখছেন অনেকে। মাঝেমধ্যে ভোক্তা-অধিকারসহ বিভিন্ন সংস্থার হম্বিতম্বি দেখা গেলেও কাজের কাজ কিছু যে হচ্ছে না বাজারের বর্তমান দৃষ্টান্তই বড় প্রমাণ। যে কারণে মূল্যবোধ সমাজ থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে, জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হচ্ছেÑ প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই সুযোগে মহলবিশেষ বাজার কারসাজি করে দাম তাদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তাই বাজারভিত্তিক নীতি এখানে অচল ও অকার্যকর। এই সিন্ডিকেট প্রতিরোধে আইন থাকলেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। অনেকে মনে করছেন, সরকারের এই অসহায়ত্ব বা নীরবতার পেছনে ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ থাকতে পারে। যারা বাজার তদারক করবেন, নিয়ন্ত্রণ করবেন, তারা নিজেরাই যদি বাজারের অংশীদারত্বের সুবিধাভোগী হন তাহলে এই সিন্ডিকেট ভাঙবে কে? আমরা মনে করি, দীর্ঘমেয়াদি বাজার-শৃঙ্খলা ও বাজার নিয়ে মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সব ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কঠোর হাতে দমন করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ ধরনের অর্থনৈতিক অসংগতি দূর করা কার্যত দুরূহ। অতীতে দেখা গেছে, সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ‘বাজারযুদ্ধ’কে আরও কঠিন ও দীর্ঘায়িত করে তুলতে। তাই বাজার অনিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছার আগেই উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা অতি জরুরি।
এই ক্ষেত্রে সরকারের উচিত বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। উল্লিখিত সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। বরাবরের অভিযোগ উৎপাদক তথা কৃষকদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টি। এই বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী ‘বাজার ব্যবস্থাপনা’ গডার দাবিও দীর্ঘদিনের। যেখানে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের তালিকার উল্লেখসহ পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিদিনের বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালানো যেতে পারে। আমরা মনে করি, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। একটি স্থিতিশীল বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবেÑ সেটাই প্রত্যাশা।