× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

অর্থনৈতিক সাফল্যের এক বছর

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:২১ পিএম

অর্থনৈতিক সাফল্যের এক বছর

২০২৪ সালের আগস্টে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ছিল মারাত্মক চাপের মুখেÑ প্রবৃদ্ধি কমছিল, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে দুই অঙ্কে অবস্থান করছিল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত খরচ হয়ে যাচ্ছিল, ব্যাংকিং খাত তারল্য সংকটে ভুগছিল, জ্বালানি খাতে বৈদেশিক দেনা বাড়ছিল, আর রাজস্ব আদায় পিছিয়ে পড়েছিল লক্ষ্য থেকে। এক বছর পর, আগস্ট ২০২৫-এ এসে চিত্র কিছুটা বদলেছে। সংকট পুরোপুরি কেটে না গেলেও অবনতি অন্তত থেমেছে, এবং অনেক সূচকে আভাস মিলেছে পুনরুদ্ধারের। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, কাঠামোগত সংস্কারের পথে যাত্রা এখনও শুরুই হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছিল ১২ শতাংশে। এর আগের সাত মাসের মধ্যে ছয় মাসই ছিল দুই অঙ্কের ঘরে, আর প্রায় তিন বছর ধরে ৯ শতাংশের ওপরে। একই সময়ে রিজার্ভ নামতে নামতে আইএমএফের বিপিএম মানদণ্ডে ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি চলে আসে। ব্যাংকগুলো আমদানি দায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল, ডলার বাজার ছিল অস্থিতিশীল, আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল প্রবল অনিশ্চয়তা।

গত এক বছরে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কারগুলো নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে  এই ক্ষেত্রে অর্থনীতির বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখা, রিজার্ভ সুসংহত করা, দেশি-বিদেশি ঋণের দায় শোধ, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি, ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। আশার কথা রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল হয়েছে। ফলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে, যা সরকারের অন্যতম সাফল্য। যদিও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি মোকাবেলায় ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন জরুরি। এ কথা সত্য যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা খুব কম। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো প্রস্তুত করা গেলে আগামী সরকার সহজেই বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারবে। তবে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের স্বস্তি দেওয়ার জন্য চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের দাবি রাখে।

এটা স্বীকার করতেই হবে বড় বড় অনেক ব্যবসায়ী নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেননি। ব্যাংক খাতের বড় বিষফোড়া তাঁদের এই খেলাপি ঋণ, যা বেড়ে এখন রেকর্ড ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকায় উঠেছে। গত দেড় দশকে একাধিক ব্যাংক জোর করে দখলে নিয়েছে এস আলম গ্রুপসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্য দীর্ঘ সময় বহাল রাখার নীতিও চালু আছে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। পুরো ব্যাংক খাতের সংস্কারে একটি কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। এ ছাড়া পুঁজিবাজার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব খাত, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই সংস্কার প্রয়োজন।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে স্মরণ করিয়ে দেন ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় অবস্থা ছিল খুবই অনিশ্চিত। এখন অন্তত বলা যায়, পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল। রিজার্ভ বাড়ছে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি দুই-ই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে, বিনিময় হারও উন্মুক্ত করার পর স্থিতিশীল রয়ে গেছে।’ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মুদ্রানীতিকে কঠোর করে, আইএমএফ নির্দেশনার অপেক্ষা না করে একাধিকবার নীতি সুদহার বাড়ায় এবং বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিকভাবে সমন্বয় করে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করা হয়, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সামঞ্জস্য করা হয়। রেমিট্যান্স : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬.৪৬% প্রবৃদ্ধি, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠেছে। রপ্তানি : ৮.৫৮% বেড়েছে, যেখানে আগের বছর প্রায় ৬% হ্রাস পেয়েছিল। রিজার্ভ : জুন ২০২৫-এ দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ৩২ বিলিয়ন ডলার, বিপিএম৬ মানদণ্ডে ২৭ বিলিয়ন ডলার। মূল্যস্ফীতি : জুন ২০২৫-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হার তিন বছরের মধ্যে প্রথমবার ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসে। তবে ‘মূল্যস্ফীতি কমানো ও রিজার্ভ স্থিতিশীল করাÑ এ দুটি ক্ষেত্রে সরকার সফল হয়েছে। তবে এটা মূলত অবনতির ধারা থামানো, উল্টোদিকে ঘোরানো নয়। খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ দাম এখনও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কষ্টকর।’

২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ২.২৩% আগের বছরের ১৫% প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। লক্ষ্য থেকে ঘাটতি ছিল ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম নিম্নতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে নেওয়া হয় কর ও শুল্ক বিভাগকে আলাদা করার পদক্ষেপ। অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ সত্ত্বেও অর্থ উপদেষ্টা এতে অনড় থাকেন। উল্লেখ্য, ‘এনবিআরকে আলাদা করা সাহসী সিদ্ধান্ত। বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার পিছু হটেনিÑ এটি সংস্কার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।’ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৫-এ দাঁড়ায় মাত্র ৬.৪%, যা একটি প্রবৃদ্ধিশীল অর্থনীতির জন্য খুবই কম। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা ২৫% কমে গেছে। সরকারি বিনিয়োগও দুর্বল ছিল এডিপি বাস্তবায়ন হার মাত্র ৬৯%, স্বাধীনতার পর সর্বনিম্ন।

এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এর ব্যাখ্যা দেন, ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে আস্থা কম ছিল। সামনে নির্বাচন থাকায় ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই অপেক্ষায় ছিল। এ ছাড়া কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট ও ঋণ দেওয়ার অক্ষমতা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।’

ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠনে সরকার কাজ শুরু করলেও, এখনও সব ব্যাংক স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ ছিল মূলত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, পরিবর্তনমূলক সংস্কার নয়। অবশ্য দেশবাসী আশা করেছিল, একটি স্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপÑ কত ব্যাংক একীভূত হবে, জ্বালানি খাতে কী হবে, রাজস্ব সংস্কারের ধাপ কীÑ এসব নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ ঘোষিত হবে। তা হয়নি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার যত এগোবে, কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তত সংকুচিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত অর্থনীতিকে পূর্ণাঙ্গ সংকটের দ্বারপ্রান্ত থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও, এই স্থিতিশীলতা নাজুক। রাজস্ব সংকট, দুর্বল বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের অমীমাংসিত সমস্যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থ উপদেষ্টা নিজের কাজের গতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘নীতিনির্ধারণ কোনো সহজ কাজ নয়। বাজেট অনেকটা বেলুনের মতো এক পাশে চাপ দিলে অন্য পাশ ফুলে ওঠে। সমন্বয় সব সময়ই কঠিন।’

গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। যেমনÑ ব্যাংক খাত সংস্কারÑ অন্যতম উদ্যোগ। এর ফলে রেমিট্যান্স, রপ্তানি বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটা ভালো অবস্থায় গেছে। পতন ঠেকানো গেছে। একটা বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করা গেছে। দরিদ্র মানুষের স্বস্তি দেওয়ার জন্য যেসব কর্মসূচি আছে তা চলমান রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার কাজও চলমান থাকা প্রয়োজন, কারণ এখনও মূল্যস্ফীতি যথেষ্ট ওপরে রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা এসেছে, এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন করে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো প্রস্তুত করলে আগামীতে যারা সরকারে আসবে তখন বিনিয়োগকারীরা সহজেই বিনিয়োগ করতে পারেন। সার্বিক অর্থে এক বছরে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আশাপ্রদ এবং ভালোই কেটেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এমন একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল এবং উন্নয়নমূলক হবে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপে প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বপ্নময় যাত্রা শুরু হয় দেশের সকল অন্যায় ও বৈষম্য সৃষ্টিকারী নিয়মনীতিকে সরিয়ে দেশের ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে। অর্থনৈতিক সংস্কার, আয়বৈষম্য দূরীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পদক্ষেপই তাদের এ কার্যক্রমকে সফলতা দেবে। অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সামনে আনলেও এ কথা সন্ধিহানভাবে বলা যায় যে, তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়ের সীমাবদ্ধতা।

  • সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান -ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা