শ্রদ্ধাঞ্জলি
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:১৯ পিএম
একসময়ের সরব রাজনীতিক মোহাম্মদ শামসুল হক নীরবেই প্রস্থান করলেন পৃথিবী নামের এই গ্রহ থেকে। তার মৃত্যুসংবাদ সেভাবে প্রচারিত হয়নি। দুয়েকজন অনুরাগী ফেসবুকে লিখেছিলেন তার চলে যাওয়ার খবরটি। ছোটখাটো এক-দুটি পত্রিকা এক দিন পরে ছেপেছিল তার মৃত্যুসংবাদ। শামসুল হকের মৃত্যুতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির শোক বাণী আসেনি। অনেকটা অগোচরেই নিজ গ্রামের গোরস্তানে পরিবার ও স্বজনদের উপস্থিতিতে তিনি সমাহিত হয়েছেন। গত ১ আগস্ট রাজধানীর মুগদার বাসায় বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন মোহাম্মদ শামসুল হক। পরদিন তাকে গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তাড়াইল গ্রামে সমাহিত করা হয়।
পরিণত বয়সেই শামসুল হকের জীবনের ইতি ঘটেছে। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। নবতিপর এই রাজনীতিক ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সরাসরি শিষ্য। তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল মওলানা ভাসানীর অনুসারী হিসেবে। শামসুল হকের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি। ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মূলত ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্টের একজন কর্মী হিসেবে তার রাজনীতির পথচলা শুরু। তরুণ টগবগে কর্মী শামসুল হক নজর কাড়েন যুক্তফ্রন্টের প্রধান রূপকার মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর। তারপর কাজ করতে করতে একসময় পরিণত হন অন্যতম সাগরেদে। স্নেহ-সান্নিধ্য লাভ করেন মজলুম জননেতার। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠিত হলে মো. শামসুল হক তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং এক পর্যায়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলা কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি বৃহত্তর ঢাকা জেলা ন্যাপের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ন্যাপের শিল্পবিষয়ক সম্পাদক হন।
আমার সঙ্গে তার পরিচয় ১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে। পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম তখন রাষ্ট্রপতি। জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। কার্যত তিনিই ছিলেন সরকারপ্রধান। পূর্বপ্রতিশ্রুতি মোতাবেক দেশে গণতন্ত্র পুনঃচালু করার উদ্যোগ নেন তিনি। সে মোতাবেক ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ চালু হয় ১৯৭৬ সালের জুন-জুলাই মাসে। সে সময় সরকার প্রবর্তিত ‘পলিটিক্যাল পার্টিস রেগুলেশন্স’ (পিপিআর)-এর আওতায় বাকশাল আইনে বিলুপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো পুনর্জীবিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগও ওই আইনের আওতায় পুনর্জীবন লাভ করে। পুনর্জীবিত রাজনৈতিক দলগুলো যে যার মতো দল গোছাতে ব্যস্ত। জন্ম নেয় কয়েকটি নতুন দলও। ওই সময়ে ন্যাপ চেয়ারম্যান মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়ার মগবাজারের বাসায় মুন্সীগঞ্জ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) ন্যাপের নেতৃবৃন্দের একটি বৈঠক ছিল। শ্রীনগর থানা জাতীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মুন্সীগঞ্জের নেতাদের মধ্যে আরও ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম (নজির মাস্টার), গিয়াস উদ্দিন খান বাদল, কাজী আজিজুল হক (লেবু কাজী), মো শাহজাহান বেপারি, নবীয়ার রহমান, আবু নাসের খান প্রমুখ। সে সভাতেই শামসুল হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি তখন বৃহত্তর ঢাকা জেলা ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক। এর কয়েকদিন পরেই কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি সভাপতি ও আমার বড় ভাই গিয়াসউদ্দিন খান বাদল সাধারণ সম্পাদক হন। এরপর জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে যাদু ভাই কেন্দ্রীয় ন্যাপের চেয়ারম্যান ও এস এ বারী এ টি সেক্রেটারি জেনারেল হন। শামসুল হক ভাই হন কেন্দ্রীয় শিল্পবিষয়ক সম্পাদক। আমার বড় ভাই গিয়াসউদ্দিন খান বাদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটি ৭১ থেকে ৭৫ সদস্যের ছিল। এখনকার মতো ৫০০-৬০০ সদস্যের হাটবাজার ছিল না। যাই হোক, যাদু ভাইয়ের বাসায় পরিচয়ের পর থেকেই শামসুল হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘানিষ্ঠতার শুরু। অত্যন্ত স্নেহ করতেন আমাকে। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এই মানুষটি ছিলেন আপাদমস্তক রাজনীতিক। সংগঠক হিসেবে তার ছিল অসামান্য দক্ষতা।
১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে ন্যাপ, জাগদল, ইউপিপি, মুসলিম লীগ, লেবার পার্টি ও তফসিলি জাতি ফেডারেশন সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’। প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি সমন্বয়ে ফ্রন্টের জেলা স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হয়। শামসুল হক ভাই ও আমার বড় ভাই গিয়াসউদ্দিন খান বাদল ঢাকা জেলা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হন। নির্বাচনে ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। মার্কা ধানের শীষ। আর নৌকা মার্কা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী (অব.)। নির্বাচন তো নয়, যেন গুরু-শিষ্যের লড়াই। শামসুল হক ভাই জেলা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হিসেবে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন জিয়াউর রহমানের পক্ষে। ওই বছর ৩ জুন অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে প্রায় এক কোটি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন জিয়াউর রহমান।
এরপর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর আগে ১৪ জুলাই মতিঝিলের হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কর্মী সম্মেলনে ন্যাপ বিলুপ্ত করে নতুন গঠিতব্য দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দলের অন্যতম নেতা আনোয়ার জাহিদের নেতৃত্বে একটি ছোট্ট গ্রুপ এর বিরোধিতা করে সম্মেলন থেকে বেরিয়ে যায়। ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা রেস্তোরাঁয় নতুন দল বিএনপির আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। শামসুল হক ভাই বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন।
বস্তুত, শামসুল হক ভাই মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়ার ছায়াসঙ্গী ছিলেন। মনে আছে, ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর ১১-১২ সেপ্টেম্বর সিনিয়র মন্ত্রী মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া আমাদের বিক্রমপুর-মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকা জেলার দোহার থানাব্যাপী দুই দিনের সফর করেছিলেন। নদীপথে সে সফরে যাদু ভাইয়ের সঙ্গী ছিলেন শামসুল হক, জিয়াউল হক মিলু, কন্যা রিটা রহমানসহ অনেকে। আমাদের শ্রীনগরে যাদু ভাই এসে পৌঁছেছিলেন রাত আটটায়। অত রাতেও শ্রীনগর পাইলট হাই স্কুল প্রাঙ্গণ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। যাদু ভাইয়ের সফরসঙ্গী হিসেবে বক্তৃতা করতে গিয়ে শামসুল হক ভাই বলেছিলেন, ‘বিক্রমপুরের মানুষের অতিথিপরায়ণতার কথা এতদিন শুনেছি। আজ সচক্ষে দেখলাম। একটি নিভৃত পল্লীর মানুষ একজন নেতাকে স্বাগত জানাতে এত রাত পর্যন্ত বসে থাকতে পারে, চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না।’ আমরা আয়োজকরা হক ভাইয়ের কথায় খুব পুলকিত হয়েছিলাম।
২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দৈনিক বাংলাদেশের খবর আমাকে তিনজন বিশিষ্ট রাজনীতিকের, যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্ব দেয়। আমি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নূহ-উল-আলম লেনিন ও শামসুল হক ভাইয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সে সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক জীবন, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব সম্পর্ক এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছিলেন হক ভাই। মুক্তিযদ্ধের স্মৃতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সম্ভবত ১২ এপ্রিল ঢাকা থেকে মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া খবর পাঠালেন তিনি কলকাতা চলে যাবেন, আমি যেন আরিচা ঘাটে তার জন্য নৌকাসহ সব ব্যবস্থা করে রাখি। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। যাদুভাইর সঙ্গে তার মেয়ে রিটা এবং ন্যাপ নেতা সিরাজুল হক মন্টুও ছিলেন। এর কয়েকদিন পরে আমিও কলকাতা যাই। সেখানে কাজী জাফর আহমদ, মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ অনেকের সঙ্গে দেখাও হয়। কিন্তু ভাসানী ন্যাপের লোক বলে আওয়ামী লীগ নেতারা আমাদের বাঁকা চোখে দেখতে থাকে। এক পর্যায়ে আবার দেশে ফিরে আসি। তখন যোগাযোগ হয় ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি তখন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারপর থেকে যুদ্ধের গোটা সময় হালিম চৌধুরীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছি। তবে, আমি সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা নই। মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী।’
শেষ দিকে হক ভাই রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও সব সময় খোঁজখবর নিতেন। আমার সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। তার অনুপ্রেরণা ও তাগিদে আমরা ভাসানী-মশিয়ূর স্মৃতি পরিষদ গঠন করেছিলাম। আহ্বায়ক সাবেক এমপি আত্তারুজ্জামান বাবুল ও সদস্য সচিব আমি। কয়েক বছর পর্যন্ত যাদুভাইর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেছি আমরা। বাবুল ভাই মারা যাওয়ার পর সে সংগঠন আর সক্রিয় থাকেনি।
মাঝে মাঝে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতেন হক ভাই। সবই রাজনীতির কথা। দেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে জানতে চাইতেন। বলতেন, ‘বাসায় এসো, অনেক কথা বলার আছে। মরে গেলে আর জানতে পারবে না।’ যাই যাই করেও আর যাওয়া হয়নি। হক ভাইয়ের ছেলে মাসুদুল হক রানা যেদিন ফোন করে জানাল তিনি আর নেই, স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। মনে পড়ে গেল হক ভাইর কথাÑ ‘মরে গেলে আর জানতে পারবে না।’ আর কখনও জানা হবে না এক সময়ের তুখোড় রাজনীতিবিদ শামসুল হকের সে না বলা কথা।