ই-মেইল থেকে
বদরুল আলম পান্না
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
লুটপাটে যেন এখন ‘এক বিরানভূমি’ সিলেটের ভোলাগঞ্জের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথর। লুট হয়েছে শত শত কোটি টাকার পাথর এবং এখনও দিন-রাত লুট হচ্ছে সমানতালে। লুট করা এই পাথর নৌ ও সড়কপথে যায় প্রশাসন ও থানা পুলিশের সামনে দিয়ে। সিলেট জেলার ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসমৃদ্ধ এলাকা। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এই স্থানটি। এখানকার মূল আকর্ষগত যত দূর চোখ যেত, দেখা যেত সাদা পাথর আর পাথর। সেখানে এখন ধু-ধু বালুচর। সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকার পাথর লুটপাটের ঘটনাটি এখন মানুষের মনোযোগের কেন্দ্র। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বিরামহীনভাবে চলছে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের পাথর লুট। এটি বর্তমানে লুটে ক্ষতবিক্ষত স্পটে পরিণত হয়েছে। পাথরের সঙ্গে বালুও লুট করা হচ্ছে। অথচ পর্যটনকেন্দ্রের চারদিকে বিজিবির চারটি ক্যাম্প ও পোস্ট রয়েছে। কিন্তু হতাশাজনক তথ্য হচ্ছে, প্রায় এক বছর ধরে বিরামহীনভাবে পাথর লুট চললেও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। জানা গেছে, এক বছরে কমপক্ষে ২ কোটি থেকে আড়াই কোটি লাখ ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য শত শত কোটি টাকা। অনেক স্থানেই ছোট-বড় পাথরের কোনো অস্তিত্ব এখন আর নেই। শুধু বালু পড়ে আছে।
প্রাকৃতিকভাবেই এই মূল্যবান সাদা পাথরের উৎস। ঢল বা স্রোতের তোড়ে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট-বড় পাথর সিলেটের সীমান্তবর্তী ধলাই নদীর উৎসমুখে জমে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া ‘জল-নুড়ি-পাথরের’ অপূর্ব সুন্দর পর্যটনকেন্দ্র ‘সাদা পাথরে’ থাবা পড়েছে প্রভাবশালী লোভীদের। এই লোভীদের ‘কালো হাত’ প্রশাসনের ক্ষমতার চেয়েও অধিক ক্ষমতাধর। কারণ তাদের আছে রাজনৈতিক পরিচয় ও শক্তি। তাই সবার নাকের ডগায় দিনে-রাতে লুট হয়েছে এবং হচ্ছে শত শত কোটি টাকার খনিজ সম্পদ। এই কালো হাতের থাবায় বদলে গেছে পাহাড়-নদী আর সবুজে বেষ্টিত ভোলাগঞ্জের বালি, পাথর, নুড়িসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের লুটপাটের দখল-নিয়ন্ত্রণ। প্রশাসন নামমাত্র অভিযান চালিয়ে লুটপাটের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও স্থানীয়রা গণমাধ্যমকে বলেছেন, লুটেরাদের সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অসৎ’ লোকজন জড়িত। আপত্তি-অভিযোগ জানিয়েও ফল হয়নি। তাদের দাবি রাজনৈতিক ও প্রশাসনের সমন্বিত এই চক্র অনেক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। অভিযোগ রয়েছে এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে আশপাশের দোকানিদের কাছ থেকে এই চাঁদাবাজিও করে থাকেন।
কড়া নজরদারির মধ্যে চলছে এই লুটপাট। বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে বানানো হয়েছে অনেকগুলো ছাউনি। সেখানে বসেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন ‘সিন্ডিকেটের’ লোকেরা। সংরক্ষিত বাংকারের পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক থেকে শত শত ইঞ্জিন ও হাতে চালিত বারকি নৌকা দিয়ে শ্রমিকরা পাথর তুলে নিচ্ছেন। কেউ নিচ্ছেন বালু, কেউবা পাথর। সবচেয়ে বেশি নৌকা রয়েছে বাংকারের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের অংশে। বালু-পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে ছোট-বড় গর্ত করে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে এলাকাটি। এলাকার গাছ ও পাকা ঘরবাড়ি কোনোটা হেলে, আবার কোনোটা ভেঙে পড়ছে। বালু-পাথর উত্তোলন করে বড় বড় গর্ত করার কারণে হেলে পড়ছে রোপওয়ের খুঁটিও। পূর্ব-উত্তর অংশের বড় পাথরগুলো আর নেই। কেউ টুকরি, কেউ বাঁশের ভার দিয়ে পাথর নিয়ে বাংকারের ভেতরে যাচ্ছেন। জানা যায়, দিনের বেলা একদল লোক পাথর সরিয়ে নিয়ে যায় বাংকারের ভেতরে। পরে সেই পাথর বাংকারের পশ্চিম দিকে এনে বারকি নৌকা দিয়ে পরিবহন করা হয়। তবে দিনের চেয়ে রাতের বেলা সাদা পাথর এলাকা থেকে বেশি পাথর সরানো হয়। কারণ রাতের অন্ধকারে লুটপাটকারীদের দেখার কেউ নেই। আর দিনের বেলা কেউ তাদের বিরুদ্ধে গেলে মারধর করা হয়। প্রশাসন অভিযান করতে গেলে তাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারা হয়। লুট করা পাথর ট্রাকে করে চলে যায় আধা কিলোমিটার দূরের ক্র্যাশার মিলগুলোতে। সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত দেড় হাজার ক্র্যাশার মেশিন আছে। এর মধ্যে ভোলাগঞ্জ ও ধুপাগুল এলাকাতেই রয়েছে পাঁচ শতাধিক।
লুটপাটের ঘটনা যে এবারই প্রথম তা নয়, তবে এখনকার লুটপাট আগের তুলনায় অনেক বেশি এবং সীমাহীন। কার্যত অঞ্চলটি নিচিহ্ন করার মতো। গত দেড় যুগে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ঘটনায় ভোলাগঞ্জ কোয়ারি, শাহ আরেফিন টিলা ও সংলগ্ন বাংকার এলাকায় অন্তত ৩৮ শ্রমিকের প্রাণ গেলেও লুটপাটকারীদের কাউকে কোনোদিন বিচারের মুখোমুখি হয়ে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়নি। বরং লুটপাটকে থামাচাপা দেওয়ার প্রশাসনিক চেষ্টায় পরোক্ষে লুটপাটকারীদের হাতকেই শক্তিশালী করা হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিগগির এ পর্যটনকেন্দ্র বিলীন হয়ে যাবে।
এই ধরনের লুটপাটের ঘটনা দেখভালের দায়িত্ব মূলত স্থানীয় প্রশাসনের। কী কারণে তারা দায়িত্বহীন ছিলেন তারও অভিযোগ উঠেছে। সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে তা তাড়ানো কঠিন। বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। যদিও সাদাপাথর লুটপাটের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে স্পেশাল টাস্কফোর্সের টিম অভিযান চালাচ্ছে। এখন নিয়মিত ওই এলাকায় টহলও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইতোমধ্যে দেশের সম্পদের যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। সাদাপাথরে নজিরবিহীন লুটপাটে প্রশাসনের দায় দেখছে সেখানে অভিযানে যাওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারাও। পর্যটন এলাকা সাদাপাথরের সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন তারা। স্থানীয় পর্যায়ে পাথর লোটপাটকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এসব স্থানের পরিবেশ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপাসহ স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন।
এই বিষয়ে মামলা হয়েছে, সরকার তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসনসহ সকলেই সর্তক। আরও স্পষ্ট যে, এই পাথর লুটপাটে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, প্রভাবশালীমহল জড়িত। মামলাও চলবে তার নিজস্ব গতিতে। দেখা যাবে মামলায় ঢাল হিসেবে ব্যবহার হবে শ্রমিকরা। ভোগান্তি আসবে সাধারণত জনগণের উপর। মূল অপরাধীরাও থাকবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অতীতে এমটাই হয়েছে। এই অপরাধ চুরি নয়, ডাকাতির সমতুল্য। আমরা চাই অতীতের মতো নয়, মূল অপরাধীর বিচার হোক শেকড় থেকেই। আসল অপরাধীরা যেন পার না পায়।