ওষুধের দাম
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৭ এএম
অত্যাবশ্যকীয় কিছু ওষুধের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্বাস্থ্য খাতকে জনবান্ধব করতে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যে ‘স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছিল। কমিশন তাদের প্রদত্ত সুপারিশে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করে। তারই অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত। কর্তৃপক্ষের দাবি, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। যার মধ্য দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সহজলভ্য হবে। যে কারণে অত্যাবশ্যক নয়Ñ এমন ওষুধের ফি উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমানো হয়েছে। সিন্ডিকেট ভেঙে কাঁচামাল যৌক্তিক মূল্যে কেনার ব্যবস্থা করায় ব্যয়ও কমেছে। ফলে মূল্যভেদে প্রতিটি ওষুধে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সুযোগ হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক, নিউমোনিয়া, সর্দি, জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাস্ট্রিক-আলসার, কৃমিনাশক, ব্যথানাশক, হাঁপানি ও ভিটামিন-সংক্রান্ত ওষুধÑ যেমন, ওমিপ্রাজল ক্যাপসুল, কেটোরোলাক ইনজেকশন, অনডানসেট্রন ইনজেকশন, সেফট্রিয়াক্সোন ও সেফটাজিডিম ইনজেকশনের দাম কমানো হয়েছে। আগামীতে আরও কয়েকটি ওষুধ এই তালিকায় আসতে পারে। এই সিদ্ধান্তে সরকারেরও প্রায় ১১৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। সিদ্ধান্তটি যে জনকল্যাণকর এবং সময়োপযোগী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহে সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব। যদিও সিদ্ধান্তটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডিসিএল-এর জন্য। বেসরকারি খাতের ওষুধ কোম্পানিগুলোর মূল্য নির্ধারণেও সরকারের অনুরূপ সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি। ১৪ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে এই তথ্যটি সবিস্তারে উঠে এসেছে।
দেশের ওষুধ শিল্প একটি দ্রুত বর্ধনশীল খাত। যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং শ্রমিক অসন্তোষ এই শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ থাকলেও এর অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৩৩,২০০ কোটি টাকার। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণে সক্ষম। এই শিল্প প্রায় ২ লাখ মানুষকে সরাসরি এবং আরও ৫ লাখ মানুষকে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। আশার কথা, দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের গুণগতমান উন্নত করতে গবেষণা ও উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়ছে। তারা নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। দেশের চাহিদার ৯৮% পূরণ করে এই শিল্প, যা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। জানা যায়, বাংলাদেশ বিশ্বের ১৬৬টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। মূলত ২০১৬ সাল থেকে ওষুধ রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অচিরেই এই বাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা ভাবা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে সক্ষম হবে। উল্লেখ্য, গত এক দশকে বাংলাদেশের শীর্ষ ওষুধ কোম্পানিগুলো আধুনিক কারখানা, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাব ও দক্ষ কর্মী বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করেছে। এতে মার্কিন, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মতো নিয়মতান্ত্রিক বাজারে মানসম্পন্ন ওষুধ সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
আমরা সবাই জানি, ওষুধ একটি জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশেই এখন বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ওষুধ রপ্তানি গত কয়েক বছরে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। নতুন বাজারে প্রবেশ, নতুন পণ্য, বাড়তি বিনিয়োগ ও দক্ষ কর্মশক্তির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২১৩ মিলিয়ন ডলার। তবে গত বছরের সঙ্গে তুলনা করা হলে রপ্তানি বেড়েছে ৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের ২০৫ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশি ওষুধ উৎপাদনকারীরা নতুন ও উদীয়মান বাজারে প্রবেশ করায় রপ্তানির এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে। চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ বর্তমানে দেশেই তৈরি হচ্ছে। দেশে উৎপাদন হয় না এরকম স্বল্প সংখ্যক ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বলা যায়, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ওষুধ শিল্পের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি ভালো অবস্থানে রয়েছে। ওষুধ শিল্পে এই অর্জন নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি।
আসলে ওষুধের সঠিক দাম নির্ধারণ কার্যত একটি জটিল বিষয়। এতে উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের মুনাফার বিষয় জড়িত। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সামর্থ্যের বিষয়টিও। এই দুটি বিষয় মাথায় রেখে সরকারিভাবে একটি ন্যায্য ও কার্যকর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি থাকা দরকার। অতীতেও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিছু ওষুধের দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হলেও, বেশিরভাগ ওষুধের দাম উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো নিজেরাই ঠিক করে থাকে। যেই ধারা আজও অব্যাহত। এতে অনেক সময় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ওষুধের বাজারে বিদ্যমান বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে জেনেরিক নামে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর বিপণনসহ মূল্য নির্ধারণের জন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো কার্যকরে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেই। ধারণা করা হয়, কোনো মহল বিশেষের স্বার্থে সেসব এখন লাল ফিতায় বন্দি।
এ কথা সত্য যে, দেশের ওষুধ শিল্প এখন একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। এর সুরক্ষা ও উন্নয়নে সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আমরা মনে করি, সরকার, বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের সমন্বয়ে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তাই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিল্পবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সরকার এই খাতের স্থিতিশীলতা ও সুনাম অক্ষুণ্ন রাখবে। আমরা আশা করি, সরকারি-বেসরকারি সকল ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করা হবে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রদত্ত সুপারিশগুলো সংযোজন করে আইনি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হবে। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকারের প্রতি সরকার সম্মান দেখাবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ করছি।