× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শুল্কযুদ্ধ

বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব এবং বিশ্ববাণিজ্যে নতুন মেরুকরণ

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৪ এএম

নিরঞ্জন রায়

নিরঞ্জন রায়

বিশ্ব এখন শুল্কযুদ্ধ বা ট্যারিফ ওয়ারে লিপ্ত। এই শুল্কযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এক ধরনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং শঙ্কা বিরাজ করছে সমগ্র বিশ্বে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্ব, সকলেই এই শুল্কযুদ্ধে আক্রান্ত এবং প্রত্যেক দেশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র যেন পারমাণবিক বোমার মতো এমন এক ভয়ংকর বোমা বিশ্ববাণিজ্যে নিক্ষেপ করে দিয়েছে, যার প্রভাবে সমগ্র বিশ্ব আক্রান্ত হয়ে একেবারে দিশাহারা অবস্থা। ফলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় বয়ে চলেছে। রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, বিশ্বনেতৃত্ব এবং এমনকি সংবাদমাধ্যমÑ সর্বত্রই এখন একই আলোচনা, তা হচ্ছে শুল্কযুদ্ধ। শুধু আলোচনা হচ্ছে বললে কম বলা হবে। একেবারে দিশাহারা অবস্থা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এরকম বাণিজ্য উত্তেজনা আগে আর হয়েছে কি না তা আমাদের জানা নেই। অতীতে গ্যাট বা জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড প্রতিষ্ঠা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে। এই গ্যাট বিশ্ববাণিজ্যে সেরকম ভূমিকা রাখতে না পারায়, বিশেষ করে ট্যারিফ আরোপের প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে না পারায়, এই সংস্থার অবসান হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউ-টি-ও অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন। এখন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও এবারের শুল্কযুদ্ধ বন্ধ করতে তারা একেবারেই অসহায়। এই শুল্কযুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে সেই গ্যাটের মতো যদি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থারও অবসান ঘটে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এই গ্যাট এবং ডব্লিউ-টি-ও কার্যকর থাকা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যেই বিশ্বে কিছু কিছু বাণিজ্য উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভর্তুকি প্রদানকে কেন্দ্র করে গত শতাব্দীর শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে চরম বাণিজ্য উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তার মাত্রা বর্তমান শুল্কযুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছেনি।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, যদি এই শুল্কযুদ্ধ দীর্ঘ হয় এবং সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছবে এবং প্রত্যেকটা দেশ তাদের মতো করে কৌশল নির্ধারণ করতে শুরু করবে। বিশ্বে যে বিভিন বাণিজ্যিক ও সামরিক জোট আছে, সেগুলোর অস্তিত্বও তখন হুমকির মধ্যে পড়ে যাওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কেননা বিশ্বে অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরে আর কোনো বড় স্বার্থ নেই। এই যে এত যুদ্ধ, এত জোট, এর সবকিছুর মূলে আছে অর্থনৈতিক স্বার্থ। সেই স্বার্থ যখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তখন প্রত্যেক দেশই নতুন করে ভাবতে শুরু করবে। এ কারণে যে শুল্কযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তার যদি সন্তোষজনক সমাধান না হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই প্রথমবারের মতো নতুন বিশ্ব মেরুকরণ বা বিশ্ব-রাজনীতির নতুন ল্যান্ডস্কেপ তৈরি হলে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না। হয়ে যেতে পারে ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যজোট, যার একদিকে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশ। আরেক দিকে থাকতে পারে চীন, ভারত, রাশিয়া, ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশ। অন্য আরেকটি দিকে থাকতে পারে ইইউ (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন) ভুক্ত দেশ, কানাডা, মেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি দেশ। আরও একটি জোট হতে পারে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে শুধু বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তেমন নয়। সেই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত একেক সময় একেকভাবে পরিবর্তন করছেন। যেমন একতরফাভাবে উচ্চ শুল্ক হারের সিদ্ধান্ত নব্বই দিনের জন্য স্থগিত করেছিলেন এবং স্থাগিতাদেশের মেয়াদ একবার বৃদ্ধি করে ১ আগস্ট পর্যন্ত বর্ধিত করেছেন। সেই ১ আগস্টও অতিবাহিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কহার এখন কোন অবস্থায় আছে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। তবে এই সময়ের মধ্যে কিছু দেশ আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে এবং শুল্কহার কিছুটা হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে আছে যুক্তরাজ্য, ইইউভুক্ত দেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং বাংলাদেশ।

আমেরিকার বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে যারা পরিচিত, যেমনÑ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং এমনকি নিকট প্রতিবেশী কানাডা এবং মেক্সিকোর সঙ্গেও উচ্চ শুল্কহারের বিষয়টি সুরাহা হয়নি। যাদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে এবং শুল্কহার কমানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেখানেও আছে শুভংকরের ফাঁকি। যেমনÑ ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ার ওপর থেকে শুল্কহার যতটুকু হ্রাস করা হয়েছে, তার সঙ্গে আমেরিকার যে সাধারণ আমদানি শুল্ক আছে, সেটি যোগ করলে মোট শুল্কের পরিমাণ প্রায় ত্রিশ শতাংশ বা তার বেশিই হবে। এত বেশি শুল্ক দিয়ে আমেরিকার বাজারে রপ্তানি কতটা সুবিধা হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ফলে আপাতদৃষ্টিতে শুল্কহার কমলেও বাণিজ্য কতটা স্বাভাবিক থাকবে সেই শঙ্কা সংশ্লিষ্ট সকল মহলের। 

চীনের সঙ্গে যে অবস্থায় শুল্কহার কমানো হয়েছে, তা মূলত চীনের পাল্টা পদক্ষেপের ফল। এই ধরনের পাল্টাপাল্টি অবস্থায় যে সমাধান হয়, তা যে দীর্ঘস্থায়ী হবে না, সেটাও অনেকের ভাবনার মধ্যে আছে। বলা যেতে পারে যে, একমাত্র সফল বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন হয়েছে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এবং শুল্কহারও হ্রাস করে পূর্বের অবস্থায় নিয়ে এসেছে। ফলে শুল্কযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত সকল দেশের সঙ্গে যে বাণিজ্য উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা স্বাভাবিক হয়েছে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের সঙ্গে। কেননা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আছে অন্য রকম হিসাবনিকাশ, যা আর কোনো দেশের সঙ্গে নেই। 

এদিকে ইইউভুক্ত দেশের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের এক ধরনের সমঝোতা হলেও, সেখানে শুল্কহার প্রায় পনেরো শতাংশ বা তার বেশি। অথচ ইইউভুক্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এক ধরনের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা ভোগ করে এসেছে। তাছাড়া ইইউভুক্ত অধিকাংশ দেশ আবার যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। দীর্ঘদিনের সামরিক মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরণ ইইউ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে হয়তো মুখরক্ষার স্বার্থে এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানোর উদ্দেশ্যে ইইউভুক্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় গেলেও, তারা যে যথেষ্ট হতাশ হয়েছে এবং আগামীতে যে যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে বিকল্প কোনো পথে হাঁটতে পারে, সেই সম্ভাবনা যথেষ্টই আছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে আকস্মিক শুল্কহার পূর্বের আরোপিত পঁচিশ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে পঞ্চাশ শতাংশ করেছে। ভারতও বৃহৎ অর্থনীতির দেশ, তাই তারা অন্যান্য ছোট দেশের মতো সবকিছু সহজে মেনে নেবে না।। তারাও চীনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেনি এবং প্রথমেই প্রায় চার বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র ক্রয়চুক্তি স্থগিত করেছে। এখানেই শেষ নয়। ভারতের বিরুদ্ধে এত উচ্চ হারের শুল্কের কারণে ভারত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিকট প্রতিবেশী এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু রাষ্ট্র, কানাডার সঙ্গে শুল্কহারের কোনো সুরাহা হয়নি এবং আগামীতে যে সুরাহা হবে, সেই লক্ষণও নেই। আরেক প্রতিবেশী দেশ, মেক্সিকোর সঙ্গেও একই অবস্থা। অনেক জাপানি কোম্পানি মেক্সিকোতে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে। ফলে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করেছে, তার খেসারত যে শুধুমাত্র মেক্সিকোকে দিতে হবে তেমন নয়। জাপানসহ আরও অনেক দেশকেও এর ফল ভোগ করতে হবে।

সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কহারের বিষয়টি একেবারে তালগোল পাকিয়ে এক জটিল অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। অবস্থার ভয়াবহতা এতটাই গভীর এবং সংকটপূর্ণ যে ট্রাম্প প্রশাসনও হয়তো জানে না যে কীভাবে এই অবস্থার এক সন্তোষজনক সমাধান হতে পারে। সত্যি বলতে কি, ট্রাম্পের মেয়াদকালে এই সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান হবে না এবং ট্রাম্প নিজেও সেটা চান না। এরকম বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনার মধ্য দিয়েই ট্রাম্প  হয়তো তার মেয়াদকাল পার করে দেবেন। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের জন্য এক মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে, যা খুব সহজে পূরণ হবে এমন ধারণা কেউ করে না। উল্টো শুল্ককেন্দ্রিক বিশ্ববাণিজ্যের উত্তেজনার মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে নতুন নতুন বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক জোট, যা বিশ্বে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিতে পারে। 

এই ধরনের আলোচনা হয়তো দুর্মুখের মন্তব্য বা ছোটমুখে বড় কথার মতোই শোনাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যারা সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্ববাণিজ্যের ঘটনাসমূহের দিকে গভীর মনোযোগ রেখেছেন এবং এই বাণিজ্যিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী যে ভিন্ন মাত্রার হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে, সেগুলোর প্রতি যারা দৃষ্টি রেখেছেন, তারা আমার কথাগুলোকে পাগলের প্রলাপ মনে করলেও একেবারে উড়িয়ে দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। আমার এমন মন্তব্যের স্বপক্ষে আমি কিছু ঘটনার বর্ণনা উল্লেখ করতে পারতাম, কিন্তু এই অল্প পরিসরে সেটি সম্ভব নয়, তাই সুযোগ মতো অন্য কোনো পরিসরে বিষয়গুলো পাঠকদের জানানোর ইচ্ছা রইল।

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা