১৫ আগস্ট
জিবলু রহমান
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০২ এএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৫ এএম
খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭৬ সালের ১ অক্টোবর একটি সংবাদ সম্মেলনে কিছু বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা পরদিন দৈনিক ইত্তেফাক-এ ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী : অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে নয় -খোন্দকার মোশতাক’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। ইত্তেফাকের সেই সংবাদটি নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো :
‘সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং ডেমোক্রেটিক লীগের আহ্বায়ক খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, তাঁহার দল গণতন্ত্র, অবাধ অর্থনীতি ও জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী। তিনি গতকাল (শুক্রবার) তাঁহার বাসভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের মেনিফেস্টো ও কর্মসূচি ঘোষণাকালে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর জাতীয় শক্তিকে গঠনমূলক ও উৎপাদন কাজে নির্দেশিত করা এবং শান্তি ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির পরিবর্তে সমগ্র দেশে অরাজকতা বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থার রাজত্ব কায়েম করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলে জাতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৪৯ সাল হইতে তিনি আওয়ামী লীগের সহিত জড়িত ছিলেন। কাজেই বিগত শাসনামলের অপকর্মের দায়দায়িত্ব তিনিও অস্বীকার করিতে পারেন না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সাল হইতে আওয়ামী লীগ দলের মূল আদর্শকে পরিত্যাগ করে। তিনি এক দলীয় ব্যবস্থাকে সমর্থন করিতে পারেন নাই। সেই কারণে বর্তমানে আওয়ামী লীগের সহিত তাঁহার পক্ষে কাজ করা সম্ভব হইবে না বলিয়া তিনি নূতন দল গঠন করিয়াছেন।
খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, তাঁহার দল গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে বিশ্বাস করে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশকে গৃহযুদ্ধ রক্তপাতের হাত হইতে বাঁচানোর জন্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি আরও বলেন, ঐদিন বেতার ভবনে সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের সহিত ৩ ঘণ্টা আলাপ আলোচনার পর তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাহাকে জোরপূর্বক লইয়া যাওয়া হইয়াছিল কি না, তিনি সে প্রশ্নের জবাব সরাসরি না দিয়া বলেন, আমাকে “ডিফেন্স ফোর্স” নিয়া গিয়াছে। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সেনাবাহিনীর সহিত ক্ষমতা ভাগাভাগির কথা অস্বীকার করিয়া তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট হইতে ২ নভেম্বর পর্যন্ত জনগণের পক্ষ হইতে আমিই দেশ শাসন করিয়াছি।
১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি পূর্বাহ্নেই তাঁহার সমর্থন ছিল বলিয়া কর্নেল ফারুক প্রদত্ত বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৫ আগস্টের পূর্বে কর্নেল ফারুকের সহিত তাঁহার কখনও সাক্ষাৎই হয় নাই। অপর দুইটি রাজনৈতিক দলের ন্যায় তাঁহার দলও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চারজন নেতার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দাবি করিবে কি না, এই মর্মে এক প্রশ্নের জবাবে জনাব মোশতাক বলেন, সরকারের কাছে এ সম্পর্কে যে সকল নথিপত্র আছে তাহা দেখিয়াই সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন।
তিনি বলেন, তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং শুধু জেলের হত্যাকাণ্ডই নহে, সকল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেন। কারণ বাঁচার হক প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে। তিনি যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, সেই সময়ই জেলখানার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলিয়া জনাব মোশতাক উল্লেখ করেন।
তিনি এখন পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেন নাই কেন, জিজ্ঞাসা করা হইলে সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগত সরকার এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে না।
এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মোশতাক বলেন যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ২ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকাকালে দেশে কোথাও একটি বুলেটও ব্যবহৃত হয় নাই এবং একবিন্দু রক্তপাতও ঘটে নাই।
তাঁহার দল ক্ষমতায় গেলে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হইবে কি না, জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, জাতি হইলেই উহার পিতা, চাচা, জ্যাঠা থাকিতে হইবেÑ এমন কোনো কথা নাই। তবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা কে তাহা জাতি এবং ইতিহাসই বিচার করিবে।
ডেমোক্রেটিক লীগের আহ্বায়ক বলেন, বর্তমান সরকার সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী বাতিল করিবেন বলিয়াই তিনি আশা করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁহার দল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বরং অবাধ অর্থনীতিতে বিশ্বাসী।
বাংলাদেশের ৪টি মৌল রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম হইতেছে সমাজতন্ত্র। কাজেই তাহার দল ক্ষমতায় গেলে উহা পরিবর্তন করিবে কি না, জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি হ্যাঁ সূচক জবাব দেন।
খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, তাঁহার দল স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতিতে বিশ্বাসী। আমরা সকলের সহিত, বিশেষ করিয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহিত বন্ধুত্ব কামনা করি।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিবাদ আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যাহত করিবে। ভারতের সহিত ২৫ বৎসর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের প্রতি কল্যাণকর না হইলে যেকোনো চুক্তি বাতিল করা উচিত। কারণ বন্ধুত্ব একতরফা হইতে পারে না। এই ধরনের কোনো চুক্তি এখনও বলবৎ আছে কি না সে সম্পর্কে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। ইহা ছাড়া বন্ধুত্বের লক্ষণটিও ভালো দেখা যাইতেছে না বলিয়া তিনি উল্লেখ করেন।
দলের ঘোষণাপত্রে বলা হয় : “সমতা, সম-অধিকার ও সমমর্যাদার স্বীকৃতি এবং একের ঘরোয়া ব্যাপারে অপরের কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে এই উপমহাদেশে তিনটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অবস্থিতি। সেইহেতু আমাদের পার্টির উদ্দেশ্য হইবে তিনটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মৈত্রী ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এই অঞ্চলের শান্তি তথা দক্ষিণ এশিয়ার ও বিশ্বের শান্তি নিশ্চিত ও মজবুত করা এবং যুদ্ধবিগ্রহে সম্পদের অপচয় না করিয়া সে সম্পদ রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন ও জনসাধারণের সেবা ও কল্যাণে নিয়োগ করা।”
ডেমোক্রেটিক লীগের আহ্বায়ক বলেন, ফারাক্কা সমস্যা সমাধানে তাঁহার দল বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করিবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে জাতীয় সংসদে তিনি ফারাক্কা সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা বলিয়া ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে একমত না হওয়ায় তাঁহাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরাইয়া দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ফারাক্কা সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান না হইলে জাতীয় জীবনে বিপর্যয় অনিবার্য।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়া জাতীয় সমস্যার সমাধান হয় না। কাজেই তাঁহার দল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষপাতী। নির্বাচনে পার্লামেন্টে শতকরা ১০টি আসন না পাইলে ঐ দল বাতিল হইয়া যাইবে বলিয়া যে শর্তের কথা উল্লেখ করা হইতেছে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হইলে জনাব মোশতাক বলেন, আইন করিয়া কাহাকেও গণতান্ত্রিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করা ঠিক হইবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে। ৪৬টি রাজনৈতিক দল সম্পর্কেও তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমেই দল বাছাই হওয়া ভালো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, বৃহত্তর ঐক্য গড়ার উদ্দেশ্যে তিনি ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বিভিন্ন নেতার সঙ্গে আলোচনা করিয়াছেন। বাংলাদেশ মুসলিম লীগের আহ্বায়ক খান এ সবুরের সহিতও আলোচনা হইয়াছে। কিন্তু তাঁহার দল কোনো জোট বা যুক্তফ্রন্টে বিশ্বাসী নহে। কোন কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করিয়া একই প্লাটফর্মে আসতে পারে।
দলের ঘোষণাপত্রে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের ম্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়া বলা হয়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নাই এবং এদেশে মীরজাফরদের কোনো স্থান নাই। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতাকারীদের প্রতি এই “মীর জাফর” শব্দটি ব্যবহার করা হইয়াছে কি না, জিজ্ঞাসা করা হইলে জনাব মোশতাক না সূচক জবাব দিয়া বলেন, যাহারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বর্তমানে কাজ করিতেছে শব্দটি তাহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে একদল লোককে মীরজাফর আখ্যায়িত করা হইয়াছিল এবং বর্তমানে আরেক দল লোককে ঐভাবে আখ্যায়িত করিয়া তিনি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের বিরোধিতা করিতেছেন কি না, জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি উহার কোনো সুস্পষ্ট জবাব দেন নাই।
ডেমোক্রেটিক লীগের ২৪ পৃষ্ঠা মেনিফেস্টোর ৭টি পরিচ্ছেদে দলের মূল নীতিসমূহ, জাতীয় অর্থনীতি এবং উন্নয়নমূলক ও সংস্কারমূলক কর্মসূচি প্রদান করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতে খন্দকার মোশতাক আহমদ একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, জাতীয় সমস্যা দূরীকরণের প্রচেষ্টায় আমরা সকল প্রকার মন্ত্রতন্ত্রের কঠোরতা ও মতবাদগত সংঘর্ষ পরিহার করিয়া চলিব এবং বাংলাদেশের বিপুল জনসমষ্টির খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থানের মতো মৌলিক সমস্যাদির সমাধানে সচেষ্ট থাকিব।’
সেদিনের সংবাদ সম্মেলনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে ১৯৭৬ সালের ৩০ নভেম্বর মোশতাকসহ ডেমোক্রেটিক লীগের শীর্ষ নেতাদের ‘রাষ্ট্রের পক্ষে অনিষ্টকর কার্যকলাপের দায়ে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।