প্রধান উপদেষ্টার সফর
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:২৪ পিএম
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটির সঙ্গে সুদৃঢ় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি সেই ১৯৭২ সাল থেকে। উভয় দেশেরই নিজ নিজ রাজধানীতে দূতাবাস রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশই দেশটির বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি, জ্বালানি সহযোগিতা, শিক্ষা এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সুসম্পর্ক বিরাজমান। সহজ করে বললে, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আজ সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বিশেষ করে শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। সময়ের প্রয়োজনে একে অপরের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। ১৩ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘দুদেশের অংশীদারত্ব জোরদারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও গভীর এবং ভবিষ্যৎমুখী কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টি উঠে এসেছে। মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র পুত্রজায়ায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বে এসব বিষয়ে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তিন দিনের সরকারি সফরে গত সোমবার মালয়েশিয়ায় যান। তিনি এই সফরে অভিবাসন ও বিনিয়োগ, সমঝোতা স্মারকসহ বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসা ও অন্যান্য সহযোগিতা সংক্রান্ত পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে হালাল ইকোসিস্টেম, উচ্চশিক্ষা এবং কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ক তিনটি নোট বিনিময় হয়েছে।
আমরা মনে করি, এই সফর দুদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় ও সুসংহত হবে। এটা স্বীকার্য যে, বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াতে চায় এবং একই সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে চায়। যা এই সফরে প্রত্যাশার দ্বার নতুনভাবে উন্মুক্ত করেছে। এ কথা সত্য যে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে মুক্তবাণিজ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছে।এই ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের বিবেচনা রাখে। আমরা আরও মনে করি, অবাধ বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে বহুবিধ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার এখনই উপযুক্ত পরিবেশ।
সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আমাদের রিজার্ভের একটি বড় অংশ আসে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীদের কাছ থেকে। বর্তমানে ১০ লাখেরও অধিক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মরত। দক্ষ জনশক্তির রপ্তানির মাধ্যমে সেখানে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে কিছু এজেন্সি এবং প্রতিযোগী কিছু দেশ আমাদের স্বার্থের পরিপন্থি ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শ্রমিকদের কল্যাণ প্রসঙ্গে যখন গঠনমূলক আলোচনা হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু মহল বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে চায়। তবে আশার কথা, প্রধান উপদেষ্টার এই সফরে নতুন কর্মীদের সম্মানজনক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তার প্রতি নিশ্চয়তা এবং নতুন করে বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থানের বিষয়ে আশাপ্রদ আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যেই ভিসাপ্রাপ্ত প্রায় আট হাজার কর্মী, যারা নির্ধারিত সময়ে মালেয়েশিয়ায় গমন করতে পারেননি তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির সঙ্গে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য হলেও বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় নামেমাত্র। মালয়েশিয়া থেকে মোটাদাগে পেট্রোলিয়াম পণ্য, পাম-অয়েল এবং রাসায়নিক আমদানি এবং টেক্সটাইল, পাদুকা এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্য হয়েছে ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। আর রপ্তানি করেছে মাত্র ৩২৯ মিলিয়ন ডলার। রপ্তানিকারকদের দাবি, মালয়েশিয়ায় কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে। আমাদের দেশের অনেক ব্যবসায়ী এসব জটিলতা এড়িয়ে ব্যবসা চালাতে পারেন না। পাশাপাশি, দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কম দামে বা স্টক লট বিক্রি, অবৈধ পণ্য বিক্রি ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব বন্ধ করে আসল ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিলে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে। অর্থনীতিবিদরা শুল্ক বিভাগের তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পরামর্শ দিচ্ছেন। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনে নজর দেওয়ার কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।
যেকোনো রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিদেশ সফর থেকে দেশ অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। প্রধান উপদেষ্টার মালয়েশিয়ার এই সফর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হয়ে থাকবে। সফরে উভয় দেশ বাণিজ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই সফরের অন্যতম বড় সাফল্য হলো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক চুক্তি। যা ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো বহুদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। বৈঠকে এই সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে। মালয়েশিয়া বহুদিন ধরেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে ছিল। ভব্যিষতেও থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে মালয়েশিয়া আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, গভীর সমুদ্রবন্দর, মাছ চাষ এবং সামুদ্রিক পর্যটন খাতে দেশটি থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। বাংলাদেশকে আসিয়ান-এর বিভিন্ন সহযোগী প্রকল্পে যুক্ত করার ব্যাপারে মালয়েশিয়া সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার এই বৈঠক কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অর্থনীতি, কর্মসংস্থানসহ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা উভয় দেশের জন্য হবে কল্যাণকর। এখন দেখার বিষয়, স্বাক্ষরিত চুক্তি ও অঙ্গীকারগুলো কত দ্রুত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।