× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মার্কিন শুল্ক

রপ্তানি অর্থনীতির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:২০ পিএম

রপ্তানি অর্থনীতির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। এই খাতই বিদেশি মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২০% শুল্ক আরোপ করায় এখন মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে। এ পদক্ষেপ শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না বরং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য কাঠামো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন শুল্কনীতি যে শুধু অর্থনৈতিক বিবেচনায় গৃহীত, তা বলা কঠিন। এতে দৃশ্যমানভাবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়গুলো জড়িত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা শ্রমিকদের অধিকার, টেকসই উৎপাদন এবং ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকার থেকে অনেক খারাপ পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বাংলাদেশের তুলনায় কম শুল্কে রপ্তানি করতে পারবে?

অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের শ্রম আইন, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম, গণতন্ত্র চর্চা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু উদ্বেগ আছে, যা বাণিজ্যিক নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি মূলত চীনের আধিপত্য মোকাবিলায় দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নতুন কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণের অংশ, যেখানে বাংলাদেশকে চাপের মুখে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির একটি বড় গন্তব্য। যেখানে ২০২৪ সালে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে এই অর্ডার সংখ্যা কমতে পারে। যেখানে ভিয়েতনাম মাত্র ২০% শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছে, সেখানে বাংলাদেশের ৩৬% শুল্কের বোঝা চূড়ান্ত মূল্যকে অনেক বাড়িয়ে তুলবে। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং অনেক ক্রেতা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকবে। 

প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যার বেশিরভাগই নারী, এই তৈরি পোশাক খাতে সরাসরি কাজ করেন। রপ্তানি আদেশ কমে গেলে কারখানা বন্ধ, ছাঁটাই এবং মজুরি বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি করবে, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করতে পারে।

ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। একইভাবে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে অর্থনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ন্যূনতম শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে পেরেছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই কৌশলগত ও কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল কিছুটা দুর্বল। গত কয়েক বছর ধরে জিএসপি সুবিধা পুনরুদ্ধারের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে শ্রম অধিকার ও স্বচ্ছতা ঘাটতির অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। অথচ পোশাক খাতের অনেক ফ্যাক্টরি ইতোমধ্যে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

যদিও মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, তবে এটিকে শুধুই সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার নতুন জানালা হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, রাশিয়া, ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ আছে আমাদের ব্যবসায়ীদের। এ ছাড়া শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ না থেকে আইটি খাত, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়া, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্য ও হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশকে শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে স্থানান্তর করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে।

অন্যদিকে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হবে। এই শূন্যতা পূরণে বাংলাদেশ একটি বড় সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠতে পারে।

ভারত তার অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষায় চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। এতে করে ভারতীয় আমদানিকারকরা বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ নিকটতম প্রতিবেশী, সংস্কৃতি ও বাজার ঘনিষ্ঠতা, স্বল্প পরিবহন খরচ এবং পূর্বে থেকেই স্থাপিত বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে ভারতীয় বাজারে পণ্যের বিকল্প উৎস হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক পণ্য, কেমিক্যাল ও কৃষিপণ্যে বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও স্থিতিশীল হবে এবং নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ বাংলাদেশকে নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে, সেখানে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নতুন দিগন্তের দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

আমাদের করণীয় ও কৌশল

১. কূটনৈতিক সংলাপ ও যুক্তরাষ্ট্রে লবিং : যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি, সিনেট ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সংলাপ বাড়ানো জরুরি। শ্রম অধিকার ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে দেশের অগ্রগতি তুলে ধরতে হবে প্রামাণ্য তথ্য ও লবিংয়ের মাধ্যমে।

২. এফটিএ ও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে উদ্যোগ : দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য বাজারেও বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধা পায়।

৩. শ্রম পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন : আইএলও’র মানদণ্ড মেনে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং শুল্ক ছাড়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।

৪. রপ্তানিতে সরকারি প্রণোদনা : বাড়তি শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তা, রপ্তানি প্রণোদনা ও ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেললেও এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার উপলক্ষ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। একদিকে কূটনৈতিক ও নীতিগত কৌশল অবলম্বন করে বর্তমান বাজার ধরে রাখা, অন্যদিকে বহুমুখীকরণ ও বিকল্প বাজারে প্রবেশÑ এই দুই কৌশলের সমন্বয়েই ভবিষ্যতের টেকসই রপ্তানি কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। সরকারকে বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত রপ্তানি কৌশল গ্রহণ করতে হবেÑ যেখানে শুধু তৈরি পোশাক নয়, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়ন হবে মূলমন্ত্র। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু প্রতিকূলতা জয় করে আজকের অবস্থানে এসেছে। এবার সময় এসেছে শুল্কের চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করার, যেন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক, শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

  • কলাম লেখক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা