অপরাধ জোন মোহাম্মদপুর
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩০ এএম
রাজধানীর মোহাম্মদপুর যেন আবারও ফিরে এসেছে সেই নব্বই দশকের জমানায়। দাপুটে সন্ত্রাসীদের আধিপত্যে সেই সময় মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিরাজ করত ভয়ানক ‘আতঙ্ক’। রাজনৈতিক মদদ এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার সুযোগে তখন সন্ত্রাসীরা হয়ে উঠেছিল দুর্ধর্ষ-অপ্রতিরোধ্য। ঢাকার রাজপথে দিনদুপুরে খুনখারাবি, ঝুট ব্যবসার দ্বন্দ্ব, টেন্ডার, দখল-চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তার, প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি কিংবা অস্ত্রের মুখে ছিনতাই-ডাকাতি এবং খুনের মতো ঘটনা ছিল অনেকটাই নৈমিত্তিক বিষয়। তবে সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গিয়েছিল এক সময়। মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই পুরনো চিত্র। এলাকাটি যেন আবারও পরিণত হয়েছে অপরাধের ঘাঁটিতে। ঢাকা শহরে যে ৫০টি থানা আছে, তার সব কটিতে অপরাধ তথা খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও হানাহানির মাত্রা কম-বেশি দৃশ্যমান। তবে মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। কেবল রাতেই নয়, এখানে প্রকাশ্য দিবালোকেও খুন, ছিনতাই ও দলবদ্ধভাবে ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটছে। এলাকাটির ‘ভয়াবহ ক্রাইম জোন’ হয়ে ওঠাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও দক্ষতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। থানার ওসির বিরুদ্ধে উঠছে অসদাচরণ ও ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ। ১২ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
‘অপরাধের স্বর্গরাজ্য মোহাম্মদপুর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের মে, জুন ও জুলাই মাসে ৪৫টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। গত ছয় মাসে ডাকাতি ও ডাকাতির চেষ্টায় ২৩টি মামলা হয়েছে। এই ৬ মাসে ১৯টি চাঁদাবাজির মামলা ও ৯ মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ১৭টি। চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাত মাসে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৭৯ জন। মাদক ব্যবসা ঘিরে প্রতিদিনই কোটি টাকার বাণিজ্য হয় এই এলাকায়। টাকার একটি বড় অংশ যায় স্থানীয় থানা পুলিশসহ বিভিন্ন স্তরে। পুলিশ বলছে, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে মোহাম্মদপুরে। এখানে ২০৫ জন ছিনতাইকারী ১০৮টি ছিনতাই সংঘটিত করছে।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও বাজারসহ নানা খাতের দখল নিতে মরিয়া এই এলাকার বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দিতে প্রায়ই জড়াচ্ছে সংঘর্ষে। প্রদর্শন করছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে এই এলাকায়। মানুষকে কুপিয়ে সন্ত্রাসীদের অবলীলায় চলে যাওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। মোহাম্মদপুরের বিশাল এলাকার একটি বড় অংশ ঘিরে রয়েছে বিহারি ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রিসহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ বেশ পুরনো। এখানে ছিনতাইকারীসহ পেশাদার অপরাধীদের আস্তানাও গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের অভিযানে এসব তথ্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে মাত্র ২০০ পুলিশ সদস্য। পুলিশ টহলের জন্য সচল যানবাহন আছে ৭টি। অথচ পার্শ্ববর্তী আদাবর থানা এলাকায় বসবাস করে মাত্র ৬ লাখ বাসিন্দা। সচল যানবাহন আছে ৫টি। সেখানে দায়িত্ব পালন করছে ৯৮ জন পুলিশ সদস্য। দুই থানার এমন পার্থক্যই বলে দেয় মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের অবহেলিত নিরাপত্তার বিষয়টি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হয়ে ওঠে মোহাম্মদপুর। পুলিশ ও র্যাবের তথ্য বলছে, ৫ আগস্টের পর মোহাম্মদপুরসহ পাশের চারটি থানা এলাকা থেকে মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও হত্যায় জড়িত অন্তত দেড় হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এত সংখ্যক অপরাধীর গ্রেপ্তারের পরও অপরাধ না কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে, দ্রুততম সময়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে তারা আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে। এরা চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের প্রশ্রয় পাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখানে পুলিশের বাইরে র্যাব, বিজিবি ও যৌথ বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আছেন। মাঝেমধ্যে এসব এলাকায় অভিযানও চলে। দেখা গেছে, অপরাধীরা ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে কেবল নতুন করে অপরাধ করছে না, থানায় মামলা দায়েরকারীদের ওপরও প্রতিশোধ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী। অনেকে এলাকা ছেড়েছেন, এখনও কেউ কেউ ছাড়ছেন। সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় একটা ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিরাপদ বোধ করবেন।
এ কথা সত্য যে, কোনো এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে কি না সেটি বোঝা যায় সেই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে। অপরাধের ব্যাপ্তি দেখে। মোহাম্মদপুরের বিষয়টিও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বারবার একই ধরনের অপরাধ এখানে সংঘটিত হচ্ছে কেন সেদিকে লক্ষ করতে হবে। প্রশাসন কেন এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। প্রশাসনের ঘাটতিই বা কোথায়? অতি সম্প্রতি পুলিশ সংক্ষুব্ধ একটি পক্ষের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলÑ এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ওপর প্রভাব ফেলছে। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হলে, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাববলয় থেকে বের করতে হবে। পুলিশের নিজস্ব ক্ষমতায়নের জায়গাকে বৃদ্ধি করতে হবে।
মোহাম্মদপুরের মতো অপরাধ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন মেগাসিটি ও ছোট্ট শহরগুলোতেও ঘটে থাকে। কিন্তু সেখানে ঘটনার পর প্রতিকার পাওয়া যায়। আমাদের দেশে প্রতিকার মেলে খুবই কম। এতে রাজধানী হিসেবে ঢাকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা মনে করি, যেকোনো মূল্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না কেন, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে যৌথ বাহিনীর অভিযানের পরিধি বাড়াতে হবে। ঘটনা ঘটে গেলে নয়, অঘটনের আগেই তা ঠেকাতে হবে। প্রয়োজনে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত কেউ অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে কি না কিংবা নিজেরাই জড়িয়ে পড়ছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে। প্রতিটি অপরাধের বিরুদ্ধে নজর দিতে হবে। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখতে হবে। বাসাবাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। নাগরিকদের সচেতন করতে ও সাহস জোগাতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, রাজধানীসহ সারা দেশে হত্যা-খুন, ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। ১৫ লাখ অধিবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।