ক্রীড়া
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৮ এএম
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ফুটবল চলছে অরাজকতা, আস্থাহীনতা, অস্থিরতার মধ্যদিয়েÑ দিগভ্রান্তভাবে। মানুষ জানে না ফুটবলে স্বচ্ছতা এবং লক্ষ্য কী। ফুটবলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সায় বিশেষ করে পুরুষ ফুটবলে প্রাপ্তির অনেক ফারাক। লম্বা লম্বা কথা বলা হয়। ‘স্লোগান’ দেওয়া হয় ফুটবল জাগরণের। কিন্তু এই জাগরণ কীভাবেÑ তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ভাবা হয়, আম পাবলিক ঠিকই স্লোগান খাবে। বারবার বলা হয়ে থাকে, ফুটবলের কঠিন সময় সাময়িকÑ সামনে ভালো সময় আসছে।
আগের তুলনায় দেশজুড়ে ফুটবল এখন অনেক কম মাঠে গড়ায়। কিন্তু কেনÑ এটি নিয়ে কি সম্মিলিতভাবে কখনও ভাবা হয় না। উপজেলার কথা বাদই দিলাম, কয়টি জেলা শহরে নিয়মিতভাবে লিগ, টুর্নামেন্ট ও শিল্ডের খেলা অনুষ্ঠিত হয়? এই যে খেলা হচ্ছে না, খেলা অনুষ্ঠিত না হওয়া দেশের ফুটবলকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছেÑ এটি নিয়ে জোরালো আওয়াজ কোথায়? আগে জেলা এবং মহকুমা পর্যায়ে নিয়মিতভাবে মৌসুমে ফুটবল মাঠে গড়াত। এখন সব সময় শুনতে হচ্ছে অনেক সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা আর অজুহাতের গল্প। ফুটবল পরিচালনার পেছনে সেই মানুষগুলো, সেই উৎসাহদাতাদের শূন্যস্থানগুলো কেন পূরণ হচ্ছে না।
জেলায় জেলায় আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা কি এতই করুণ যে ছোট পরিসরেও ফুটবল লিগের আয়োজন সম্ভব হয়ে ওঠে না? মফস্বল শহরগুলোর ক্রীড়াঙ্গনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বিভাজন লক্ষণীয় হচ্ছে। এতে করে সম্মিলিতভাবে অঙ্গীকারের অভাব। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে অসংগতিগুলোকে সংশোধিত করার কোনো উদ্যোগ নেই। সব ক্ষেত্রে গা-ছাড়া ভাব। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে শুধু ফুটবল নয় সব খেলার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা এবং পরিষেবায় দুর্বলতা স্পষ্ট। মানুষ ফুটবল নিয়ে হতাশায় ভুগছে। হামজা চৌধুরী, সুমিত, ফাহামিদুলরা এসে ঘুমিয়ে থাকা ফুটবলকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছেনÑ এটি সত্য। তবে ফুটবল নিয়ে সত্যিকার অর্থে কিছু ভাবলে সেটি পরিকল্পনার আওতায় এনেই ভাবতে হবে। এখন যেভাবে দেশের ফুটবল চলছেÑ এটি সঠিক চলা নয়। বিভিন্ন কারণে বাফুফের কোনো কর্তা-কর্মকর্তা দারুণভাবে তার পদবি উপভোগ করছেন। প্রচারের আলো তাদেরকে আলোকিত করে রেখেছে। এখন যারা বাফুফের হাল ধরে আছেন তাদের মেয়াদ প্রায় এক বছর শেষ হতে চলেছেÑ এই এক বছরে বাফুফের কার্যকরী ভূমিকা কী এই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এই সময়ের মধ্যে নারী ফুটবল ভীষণভাবে উজ্জ্বলÑ বাফুফে নারী ফুটবলের জন্য তো কিছুই করতে পারেনি। স্পন্সর জোগাড় করার কথা বাদই দিলাম। সরকারের সঙ্গে বসে একটি পৃথক প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড কি নিশ্চিত করতে পেরেছে? বড় কর্মকর্তারা যত বেশি পেশাদার মানসিকতা এবং ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী হোন না কেন এতে কাজ হবে না, যদি না তারা ‘প্রায়োরিটি সেট’ করে সম্মিলিতভাবে কাজ না করেন। কাজী সালাউদ্দিন ভালো খেলোয়াড় ছিলেন, বুদ্ধিদীপ্ত স্মার্ট সংগঠক ছিলেন। তিনি কেন অনেকগুলো ক্ষেত্রে পিছিয়ে থেকে বছরের পর বছর পার করেছেন? বিষয়টি কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নয়। ফুটবল ব্যবস্থাপনায় তার দুর্বলতাগুলো কোথায় ছিল সেগুলো চিহ্নিত করে এখন যারা বড় নেতা তাদের উচিত সবাইকে সম্পৃক্ত করে কাজ করা। ফুটবলের রোগ নির্ণয় তো সব সময় করা হচ্ছে। সমস্যা হলো সঠিক ওষুধ প্রদান।
অতীতের সঙ্গে তুলনায় আমাদের ফুটবলের সামগ্রিক অবস্থা এই মুহূর্তে ভাল এমন বলার সুযোগ নেই। বরং ফুটবল এক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত টুর্নামেন্টের অভাবে ফুটবলে এখন ভাটার টান। অথচ এক সময় ফুটবলার তৈরির অন্যতম কারখানা হিসেবে পরিচিত ছিল আমাদের টুর্নামেন্টগুলো। দেশের আনাচ-কানাচ থেকে একের পর এক ফুটবলার এসে দাপিয়ে খেলেছেন ঢাকার মাঠে। ঢাকার ক্লাব ফুটবল নিয়েও কী উন্মাদনাই না ছিল। অথচ এখন কমতে কমতে হাতে আঙুলে এসে ঠেকেছে।
এক্ষেত্রে দেশের ফুটবলে অগ্রাধিকার ‘সেট’ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশন প্রথম থেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আর তার খেসারত গত পাঁচ যুগের বেশি সময় ধরে দিতে হয়েছে। সব সময় হা-হুতাশ পাইপলাইনে খেলোয়াড় কোথায়? কোটি কোটি মানুষের দেশে জাতীয় দল এবং ‘এ’ দল গঠন করার মতো কার্যকরী খেলোয়াড় নেই। চিন্তাভাবনা এবং পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে বাফুফের উদাসীনতা এবং বড় ধরনের ভুল দেশের ফুটবলকে শুধু দুর্বল করে রাখেনিÑ প্রশ্নবিদ্ধও করেছে। বয়সভিত্তিক দল গঠন করতে গিয়ে বারবার হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরপরও সব সময় ঘুমিয়ে থাকা আর আত্মোপলব্ধিÑ এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ঠিক আর হচ্ছে না। বিপদে পড়লে অনেক চিন্তা। গোঁজামিল দিয়ে মুশকিল আসানÑ এরপর যাহা বাহান্ন তাহাই তিপান্ন।
মেধা ও প্রতিভা থাকলেই হবে না, এটি বিকশিত করতে না পারলে তো সবকিছু অর্থহীন। জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) অধরাই থেকে যাবে। সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্দিষ্ট খেলার ভবিষ্যৎ এবং স্বপ্ন। আর এই পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয় তৃণমূল পর্যায় থেকে। ভবিষ্যতের ক্রীড়াঙ্গনের গতিপথ নির্মাণের মৌলিক উপাদান তো এখান থেকেই জোগান দেওয়া হয়। হঠাৎ করে জোড়াতালি দিয়ে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করা যায় না। ক্রীড়াঙ্গনে সঠিকভাবে হাঁটতে হলে জুনিয়র লেভেল থেকেই হাঁটা শুরু করতে হবে। অতীতে আমরা লক্ষ করেছি পাইওনিয়ার ফুটবল থেকে দেশের সেরা সেরা ফুটবল তারকা উঠে এসেছেন। তারা জাতীয় ফুটবলে অবদান রেখেছেন। অনূর্ধ্ব-১৫ পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ দেশের ফুটবলে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পিটিশন। এই কম্পিটিশন থেকেই ভালো খেলোয়াড়কে ফুটবল জহুরিরা চিহ্নিত করে থাকেন।
দুঃখের বিষয়, গত দুই বছর পাইওনিয়ার ফুটবল মাঠে গড়াতে পারেনি বিভিন্ন কারণে। ফুটবল ফেডারেশনের জন্য বিষয়টি দুঃখজনক। যেখান থেকে খেলোয়াড় বের হবে সেই কম্পিটিশন আয়োজনে ঢিলেমি তো মেনে নেওয়া যায় না। চলতি মৌসুমের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেছে। পাইওনিয়ার ফুটবল মাঠে নামতে পারেনি। দল গঠন করে ক্লাবগুলো প্রস্তুত। লিগ শুরু করার জন্য ইতোমধ্যেই বাফুফে ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে। বাফুফে নির্বাচনের পর গত বছর ৯ নভেম্বর এক বছরের জন্য পাইওনিয়ার লিগের চেয়ারম্যান করা হয় বাফুফের সদস্য টিপু সুলতানকে। তার মেয়াদ আছে আর মাত্র তিন মাসের মতো। পাইওনিয়ার ফুটবল মাঠে গড়াতে পারেনি। টিপু সুলতানকে চেয়ারম্যান করা হলেও বিভিন্ন কারণ এবং বড় কর্মকর্তাদের ব্যস্ততার জন্য লিগ কমিটি গঠন করা হয়নি। আর লিগ কমিটি ছাড়া কীভাবে পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ শুরু হবে। জানানো হয়েছে কিছুদিনের মধ্যেই লিগ কমিটি তৈরি করে দেবে ফুটবল ফেডারেশন। আর সেই কমিটি লিগ পরিচালনা করবে। শুরুতে বলেছি, অগ্রাধিকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না ফুটবলে। পাইওনিয়ার ফুটবল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লিগ। এখানে ‘গ্ল্যামারার’ নেইÑ তাই হয়তো গুরুত্ব কম। সেই ১৯৮০ সালে এই লিগে ৮০টি দল অংশ নিয়েছে।
এত সব নেতিবাচকতার মধ্যেও আমাদের নারী ফুটবলারা প্রতিনিয়ত ইতিহাস গড়ে চলেছে। ঋতুপর্ণাদের পর এবার ইতিহাস গড়লেন সাগরিকারাও! চীনের কাছে লেবানন ৮-০ গোলে হেরে যাওয়ায় সেরা তিন রানার্সআপের একটি হয়ে প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। লাওসে বাছাইপর্বে দুর্দান্ত লড়াই করে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়ে লাল-সবুজের মেয়েরা ইতিহাস গড়ে দেশে ফিরেছেন। ২০২৪ সাল থেকে দারুণ ছন্দে রয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল দল। ১২ ম্যাচ অজেয় থাকার পর ১০ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরেছে মেয়েরা। তার আগে ঘরের মাঠে টানা ৬ জয়ে সাফের শিরোপাও জিতেছে বাংলাদেশ।
দেশের ফুটবল ইতিহাসে সর্বপ্রথম ১৯৮০ সালে কুয়েতে হওয়া এশিয়ান কাপে খেলেছিল পুরুষদের জাতীয় ফুটবল দল। এরপর ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়ান কাপে খেলে বাংলাদেশের মেয়েরা। তারা আরও দুবার ২০১৭ ও ২০১৯ আসরেও খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
আমাদের ফুটবলকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে মাঠে নিয়মিত গড়াতে হবে। ফুটবলকে মাঠে ফেরাতে হবে। অতীতে যেসব লিগ আয়োজিত হতো, সেগুলো নিয়মিত করার পাশাপাশি স্কুল ফুটবল, উপজেলা ও আন্তঃজেলা ফুটবলকেও মাঠে ফেরাতে হবে। ততে করে ফুটবল ভক্তরা যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পাবেন, তেমনি ফুটবলার ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরাও। কারণ নিয়মিত ফুটবল মাঠে গড়ালে বয়সভিক্তিক ফুটবলার যেমন বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, তেমনি প্রতিভা অন্বেষণের কাজটিও সহজ হয়ে যাবে। ফুটবল নিয়ে নতুন করে কোনো আশ্বাস নয়, বরং অতীতে পাওয়া আশ্বাসগুলো কবে বাস্তবায়িত হয়, সেটাই দেখার।