× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্মরণ : আনোয়ার জাহিদ

মেধাভিত্তিক রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৬ এএম

আনোয়ার জাহিদ।

আনোয়ার জাহিদ।

দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে এক আপসহীন নেতার নাম আনোয়ার জাহিদ। বাম রাজনীতির দীক্ষা নিয়ে মাঠে এলেও পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী ভাবনা ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি দেশের জনগণকে নতুন মডেলের রাজনীতি উপহার দিয়েছেন। সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। আনোয়ার জাহিদ ছিলেন সততা ও মেধাভিত্তিক রাজনীতির প্রতিভূ। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য আনোয়ার জাহিদ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির মাঝে অকল্পনীয় যে ঐক্যের সূচনা হয়েছিল তার রূপকার ছিলেন তিনি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই রূপকারকেই একসময় দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার গড়ে দেওয়া ঐক্য ২০০১-০৬ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করলেও একবারও তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারেনি। এমনকি তার চিকিৎসার জন্যও পাশে দাঁড়ায়নি তারা।

তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এক বুক অভিমান নিয়ে। যার ফল আজও আমাদের ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ভোগ করতে হচ্ছে। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার পরে জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সার্থক নেতৃত্ব দিয়েছেন আনোয়ার জাহিদ। যখন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙুল ওঠানো হয়, তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততার দৃষ্টান্ত হিসেবে। আনোয়ার জাহিদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারও সম্পর্কে কটূক্তি বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন না, যা আজকের রাজনীতিতে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। তার প্রদর্শিত পথে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতা ভোগ করেছে।

আনোয়ার জাহিদ কখনও তার রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি যখন যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন তাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন। আমরা যখন কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক বিশ্বাসকে পদদলিত করতে কুণ্ঠিত হই না, তখন আনোয়ার জাহিদদের স্মৃতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সত্যিকারের দেশপ্রেমিক রাজনীতির সংজ্ঞা কী। নীতিহীন রাজনীতির যুগে আনোয়ার জাহিদ ছিলেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধ্রুবতারা। তার মতো মেধাবী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন।

আনোয়ার জাহিদ ১২ জুন, ১৯৩৮ সালে ঝিনাইদহের ঘোড়াশাল ইউনিয়নের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এএম দেলোয়ার হোসেন ও মাতা রাজিয়া বেগম। তিনি ১৯৫৬ সালে ঝিনাইদহ মডেল হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি খুলনা বিএল কলেজ, রাজশাহী সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ১৯৬১ সালে তিনি কারাফটকে আইনজীবী কামরুননাহার লাইলীকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

আনোয়ার জাহিদ ৫৫ সালে সাহিত্য মজলিসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেহাদের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতুর সহকারী সম্পাদক, ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক, ১৯৬০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক, ১৯৬৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক, ১৯৬৬ সালে ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডের উপসম্পাদক, ১৯৭০ সালে সাপ্তাহিক গণবাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৭২ সালে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি পিপলসের বার্তা সম্পাদক এবং পরে বাংলাদেশ টাইমসের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক ইনকিলাবের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬২, ৬৩, ৬৪, সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৫ ও ৬৬ সালে সহসভাপতি, ১৯৭৮ ও ৮৩ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৬ সালে ছাত্রলীগের ঝিনাইদহ মহকুমার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঝিনাইদহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৬২ সালে কারামুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে নিখিল-পাকিস্তান ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ সালে ন্যাপ দুই ভাগে বিভক্ত হলে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে ন্যাপ পুনর্গঠিত হলে তিনি কেন্দ্রীয় সদস্য হন।

১৯৭৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন ও ঘোষণাপত্র তৈরিতে আনোয়ার জাহিদ ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। পরে গণতন্ত্রী পার্টি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন এরশাদ সরকারের তথ্য, ত্রাণ এবং শ্রম-জনশক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জানুয়ারি, ১৯৮৮ সালে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৮৯ সালে তিনি এনডিপি এবং ১৯৯১ সালে বিএনডিপি গঠন করে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালের ১০ দলের সমন্বয়ে গঠিত এনডিএর সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসনেরর তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন।

আনোয়ার জাহিদ ১৩ আগস্ট, ২০০৮ সালে ঢাকার গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে স্মরণ করি।

যখন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙুল ওঠানো হয়, তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততার দৃষ্টান্ত হিসেবে। আনোয়ার জাহিদ রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারও সম্পর্কে কটূক্তি বা অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করতেন না; যা আজকের রাজনীতিতে দৃষ্টান্তহীন। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। আনোয়ার জাহিদ আজীবন সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে গেছেন। তার মতো মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান নেতার প্রয়োজন জাতি সব সময় অনুভব করবে।

  • কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা