× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সড়ক দুর্ঘটনা

মর্মান্তিক বাস্তবতা রোধে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১৭ পিএম

মর্মান্তিক বাস্তবতা রোধে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

সড়কে-মহাসড়কে দুর্ঘটনা যেন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই সংবাদ মাধ্যমগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার যে মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত হয়, তা বাস্তবতার একাংশ মাত্র। এর পুরো পরিসংখ্যান হয়তো আরও ভয়াবহ। প্রাণহানি, আহতদের দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক-সামাজিকসহ নানা বিপর্যয়ের কারণে সমাজের জন্য ‘বড় বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দুর্ঘটনা। দেশজুড়ে বছরের পর বছর, সড়ক দুর্ঘটনায় অগণিত মানুষের হতাহতের পরও আশ্চর্যজনকভাবে এই সংকট মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষীয় উদাসীনতা অব্যাহত রয়েছে। সড়কের নিরাপত্তা যাদের দায়িত্বে তাদের দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।

১০ আগস্ট রবিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজার ৩৮২ জন নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ৫৯ হাজার ৫৯৭ জন। রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনার সংস্কারে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের রূপরেখা : সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে বেসরকারি এই সংস্থাটি। এ কথা স্বীকার্য যে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিগত সরকারগুলো সড়কের নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এমনকি এটি কার্যত জাতীয় সমস্যা বিবেচিত হওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকার পরিবহন ব্যবস্থা সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন করেনি। অথচ সড়কে নৈরাজ্যের নেপথ্যে জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ও অপ্রতুল সড়ক অবকাঠামো, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি, গাড়ি চালকদের অদক্ষতা ও আইনভঙ্গের প্রবণতা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার বিষিয়গুলো চিহ্নিত হয়ে আসছে। এমন বাস্তবতায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বিভিন্ন মেয়াদি রূপরেখার প্রস্তাবও তুলে ধরেছে।

আসলে এসব ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেনিয়োজিতদের দায়িত্বহীনতার নির্মম পরিণতি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর ট্রাফিক পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে, কখনও চালকের বেপরোয়া চালনায়, কখন সড়কে খানাখন্দ থাকায়। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হওয়ায় অনেক সড়কে খানাখন্দ বেড়েছে। কোনো কোনো সড়কে যান চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। খোদ, ঢাকা শহরের বেশিরভাগ সড়কের বেহাল অবস্থা। দ্রুত সড়ক মেরামত করার প্রয়োজন থাকলেও সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

১১ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘সাড়ে পাঁচ বছরে নিহত ৩৭ হাজারের বেশি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটির বরাত দিয়ে স্বল্পমেয়াদি (২০২৫ থেকে ২০২৭) রূপরেখায় তুলে ধরা হয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএর শীর্ষপদে কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, কাঠামোগত সংস্কার, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার প্রশ্ন সড়ক সম্পর্কিত হওয়া, যানবাহনের আয়ুষ্কাল ও ডাম্পিং নীতিমালা তৈরি, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গঠিত ট্রাস্ট ফান্ড গঠনসহ ১০টি প্রস্তাবনা। মধ্যমেয়াদি (২০২৫ থেকে ২০২৯) রূপরেখায় আছে রোড ট্রাফিক সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরটিএমএস) চালুসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস ও মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণ। আর দীর্ঘমেয়াদি (২০২৫ থেকে ২০৩১) রূপরেখার মধ্যে আছে রাজধানীতে বহুতলবিশিষ্ট হাইড্রোলিক পার্কিং তৈরি, ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা রোধে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন একত্র করে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠনসহ কাজগুলো শুরু করলে পরবর্তী সরকার তা চলমান রাখতে বাধ্য হবে। অন্যথায় সড়কের এই নৈরাজ্য বন্ধ হবে না।

এ কথা সত্য যে, সড়ক দুর্ঘটনার নেতিবাচক পরিসংখ্যান বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিতই আমাদের সামনে উঠে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সমস্যাটির টেকসই সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ কখনও নেওয়া হয়নি। আরএসএফ পরিসংখ্যান আরও ভালো করে লক্ষ করলে অনুধাবন করা যায় সমস্যাটি কতটা ভয়ংকর ও বহুমুখী হয়ে উঠেছে। বিগত সময়ে সড়কে শৃঙ্খলা জোরদার এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ১১১ দফা সুপারিশ ছিল সংশ্লিষ্ট সংস্থার। এর আগে ২০১১ সালে ‘সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল’ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ৮৬ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল। যার বেশিরভাগই চালক, যানবাহন ও সড়কসংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রস্তাব। ২০১৮ সালে সরকার সড়ক পরিবহন আইন করেছিল। জনপ্রত্যাশা ছিল এই আইন পাসের পর সড়কে দুর্ঘটনা কমবে, যাত্রী ও পথচারীরা নিরাপদ থাকবেন। আইন হলো, এত পরিকল্পনা নেওয়া হলো, কিন্তু কার্যত কোনো কাজেই আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিরাপদ করতে কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ফলে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আরও বাড়ছে। আমরা চাই, সড়ক পরিবহন আইনটি সংস্কার করে কার্যকর করা হোক।

অবশ্য কেবল আইন প্রণয়ন বা সংস্কার করেই দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না। এর জন্য দরকার সরকারের ইচ্ছাশক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং যথাযথভাবে তা প্রয়োগ। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা তৈরি, চালকদের প্রশিক্ষণ ও দুর্ঘটনা-পরবর্তী কার্যক্রমের মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকতে হবে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনার মূল কারণ গাড়ির বেপরোয়া গতিবেগ। অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণশৈলী ও অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণ, অদক্ষ ও বাড়তি কাজ করে ক্লান্ত থাকা চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতাও। যেহেতু সড়কে হতাহতের সংখ্যা অব্যাহত থাকছে, তাই সড়কের নিরাপত্তায় জরুরি উদ্যোগ নিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুরোধ করছি। 

এ কথা সত্য যে, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও জবাবদিহিতার অভাবে সড়কে অহরহ অসংখ্য প্রাণ ঝরছে। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অবিলম্বে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নে পুলিশ ও বিআরটিএকে আরও কঠোর হতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অবৈধ চালকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। প্রতিটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং দোষীদের দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি সড়ক দুর্ঘটনাকে জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা