সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি
ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১৫ পিএম
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কৌশল হিসেবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রচলন পৃথিবীব্যাপী রয়েছে। তবে সব দেশে এ পন্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। এর মাধ্যমে বেশিরভাগ সময় চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যায়। নীতি সুদহার বাড়িয়ে বাজারে নগদ অর্থপ্রবাহ সীমিত করে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় মূল্যস্ফীতির হার। কিন্তু বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি যে কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে কমানো সম্ভব না তার অনেক দৃষ্টান্তই রয়েছে। বরং এ নীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে। অথচ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৯০ ভাগ বেসরকারি খাতনির্ভর। বলা বাহুল্য, এ খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি না হওয়ার অর্থ দেশে নতুন বিনিয়োগ বা কর্মসৃজন হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩-২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ হারে। যদিও একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, দেশে ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার আছেন। ২০২৩ সালের একই সময়ে গড় বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার।
এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগের মতোই কড়াকড়ি অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা চলতি অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে নীতিগত সুদের হার (নীতি হার) আগের জায়গায় ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছেন। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি কিছুটা কমলেও তা এখনও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে। টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর আবারও চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি যদি ধারাবাহিকভাবে কমে এবং প্রকৃত সুদের হার তিন শতাংশে পৌঁছে, তখন ধাপে ধাপে নীতি হার হ্রাস করা হতে পারে। তবে ততদিন পর্যন্ত সুদের বর্তমান হারই বহাল থাকবে।
নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামার আগপর্যন্ত কোনো প্রকার শিথিলতা আসবে না। নীতি হারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ প্রদানের হার (স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি) ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আমানত গ্রহণের হার (স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি) ৮ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। খেলাপি ঋণ ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক ব্যবস্থা, সম্পদের গুণগত পর্যালোচনা এবং আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক বেসড সুপারভিশন) চালু। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারসমূহে শুল্কবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে নমনীয়তা এনেছে। বর্তমানে দিনে দু’বার রেফারেন্স বিনিময় হার ঘোষণা করা হচ্ছে, যাতে মুদ্রাবাজারে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা আসে। তবে বিনিময় হারে অতিরিক্ত অস্থিরতা ঠেকাতে প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করবে বলেও জানিয়েছে।
সরকারের বাজেট ঘোষণায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে তাদের নীতি সহনশীল হলেও কড়াকড়ি থাকবে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতাÑ এই তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের আর্থিক নীতির মূল কৌশল স্থির করেছে বলে জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা এখন নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহী। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
এমন বাস্তবতায় ঋণপ্রবাহের বর্তমান ধারা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্ট’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে পরবর্তী দুই অর্থবছরে তা বাড়বে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। আবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়েছে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই এসব বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে ভিন্ন কিছু নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত সরকারের আমলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়া হয়েছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ানো হলেও তার প্রভাব পড়েনি বাজারদরে। এর অন্যতম কারণ ছিল বাজারে সরবরাহ সংকট, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও বিশৃঙ্খলা। সেই সঙ্গে নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট, যেমন ডলারের উচ্চমূল্য সংকট, অব্যাহতভাবে রিজার্ভ ক্ষয়, জ্বালানির অভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ইত্যাদি বাজারদর স্ফীত করে তুলেছিল। যে কারণে নীতি সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি দাম বেঁধে দেওয়া, কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার, বাজার তদারকির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে ছিল শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহারের মতো ঘটনাও। কিন্তু বাজারদর উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি। উল্টো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে চলেছে।
ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে কড়াকড়ি মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এ কারণে নীতি সুদের হার বাড়ানো হয়েছে, যা সরাসরি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহারেও প্রভাব ফেলেছে। ফলে ঋণ গ্রহণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি কমে গেছে। উচ্চ সুদের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্প, ব্যবসা ও উৎপাদন খাতে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার বিষয়টিও নতুন ঋণগ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মে মাস শেষে বার্ষিক ভিত্তিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬.৯৫ শতাংশে নেমেছে, যেখানে এক বছর আগে এ হার ছিল ১০.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি এক বছরের ব্যবধানে ৩.১৪ শতাংশ কমেছে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৭.১৫ শতাংশ, আর করোনা পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের মে মাসে একবার ৭.৫৫ শতাংশে নেমেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অর্থবছরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৯.৮০ শতাংশ নির্ধারণ করলেও তা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। এর পেছনে নীতি সুদের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি সরকারের বেশি হারে ঋণ গ্রহণ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দায়ী।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগে তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহার বেড়ে ১৪-১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে আগে ছিল ৮-৯ শতাংশ। এই উচ্চ সুদ ব্যবসায়িক ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে মুনাফা কমে যাচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণে বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়ের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন, যার ফলে ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ স্থবির হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কড়াকড়ি মুদ্রানীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং সরকারের ঋণনির্ভরতা মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান আরও চাপে পড়বে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় ভারসাম্য আনার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া বিগত সরকার পতনের পর থেকে দেশে সামাজিক-রাজনৈতিক নানা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় না থাকার কারণে নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। ব্যবসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে, তবে এমন অনিশ্চিত পরিবেশ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে ভেবে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন। ফলে বর্তমানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগও নিম্নমুখী। আবার বিনিয়োগ না বাড়লে উদ্যোগ কমে আসে। ফলে নতুন ঋণের প্রয়োজনও হয় না। তা ছাড়া আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলোরও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ফলে বেসরকারি খাত সামগ্রিকভাবে বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা, জ্বালানির অপ্রতুলতা ইত্যাদি সংকটের সমাধানও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে ক্ষেত্রে ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতি আর্থিক উন্নয়নে কতটুকু অবদান রাখবে তা ভেবে দেখার বিষয়।