টমেটো পাউডার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৩ এএম
আমাদের কৃষক বরাবরই বঞ্চনার শিকার। অথচ তারাই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলায়, সেই ফসল আমাদের অন্ন ও ফল-তণ্ডুল জোগায়। যে কারণে কবি বলেছিলেন, ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,/দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।’ কিন্তু দেশমাতার মুক্তিকামী এই কৃষককেই বারবার বেদনায় নষ্ট হতে দেখতে হয় তাদের উৎপাদিত ফসল।
চলতি বছরের মার্চে দাম না পেয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকার অনেক কৃষক ক্ষেতেই ফেলে দিয়েছিলেন টমেটো। এভাবে সারা দেশে নষ্ট হয় হাজার হাজার টন টমেটো। শুধু টমেটো নয়, আমরা দেখেছি- অতীতেও বিভিন্ন সময়ে কৃষক ক্ষোভে, বেদনায় তার উৎপাদিত ফসল নষ্ট করেছেন। ধানের দামে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব কৃষক ধানে আগুন দিয়েছেন। পাটের দাম না পেয়ে পাটে আগুন ধরিয়েছেন। বেগুন, মুলা, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। এসব খবর পত্রপত্রিকায় কখনও গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে, আবার কখনও গুরুত্বহীনভাবে ঠাঁই পেয়েছে ভেতরের পাতায়। কিন্তু কৃষকের মর্মবেদনা আমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি, আলোড়িত করেনি। আর করেনি বলেই অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। তারই উদাহরণ উঠে এসেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘মৌসুমে পচে টমেটো, তবু দেদার আমদানি হচ্ছে টমেটো পাউডার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। খবরটি আমাদের উদ্বিগ্ন করে। আমরা উৎকণ্ঠার সঙ্গে অনুভব করি, আমাদের কৃষি ও কৃষকের প্রতি অবহেলা। অথচ এই টমেটো প্রসেস করে পাউডার করা হলে লাভবান হতেন কৃষক। সাশ্রয় হতো টমেটো পাউডার আমদানিতে ব্যয়িত ডলার।
কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে টমেটো পাউডার আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১৫ কেজি। যার আমদানি মূল্য ৮ লাখ ৬ হাজার ৭২৫ ডলার। পাউডার করার মতো উদ্যোক্তা না থাকার কারণেই এই বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা চলে গেছে দেশের বাইরে। কিন্তু এমন নয় যে, দেশে টমেটো পাউডার তৈরির সুযোগ নেই। এটি তৈরি এমন কোনো জটিল প্রক্রিয়াও নয়। টমেটো শুকিয়ে এরপর সেগুলো মেশিনের সাহায্যে গুঁড়ো করলেই পাওয়া যায় পাউডার। স্যুপ, পাস্তা, সস, কাবাব, কাচ্চি, বিরিয়ানি বানাতে যা ব্যবহার হয়। অথচ এই সহজ সূত্রটিই আমরা প্রয়োগ না করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আনছি টমেটো পাউডার। যদি দেশেই এ খাতে উদ্যোক্তা তৈরি করা যায়, তাহলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে বেকার সমস্যা সমাধানের পথেও আমরা এগিয়ে যেতে পারি, যার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হতে পারে আমাদের অর্থনীতিও।
টমেটোর শুকনো পাউডারই নয়, টমেটো যদি ফ্রোজেন বা অন্য উপায়েও সংরক্ষণ করা যায়, টমেটোকে প্রসেসড ফুড হিসেবে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও উপার্জন করা সম্ভব। শুধু টমেটো নয়, একইভাবে আমরা আমাদের মৌসুমি নানা শষ্য ও ফলকেও প্রসেসড ফুড হিসেবে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে পারি। আম-কাঁঠাল, আনারসের প্রাচুর্য আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে। সেইসঙ্গে আলু, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, তরমুজ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুসসহ নানা কৃষিপণ্যকেও আমরা প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে যেমন সংরক্ষণ করতে পারি তেমনি প্রক্রিয়াজাত এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি করতে পারি। এতে করে কৃষকের সামনেও খুলে যাবে আয়ের নতুন উৎস। তাকে আর মৌসুমে নায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় ফসল নষ্ট করতে হবে না। কিন্তু আমরা মৌসুমি ফল এবং কৃষিপণ্য কোনোটিই যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছি না, রপ্তানিরও উদ্যোগ নিচ্ছি না। যার কারণে প্রতিবছর মৌসুমি ফল ও কৃষিপণ্যের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই ফল ও পণ্যগুলোই নানাভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবার হিসেবে আমরা আমদানি করছি। যা প্রমাণ করে দেশের বাজারেও প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিপুল চাহিদা রয়েছে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর দেশে উৎপাদিত সবজির প্রায় ৩০ শতাংশ মৌসুমে নষ্ট হয়। যা শুধু হারভেস্ট-পরবর্তী সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। তাই পোস্ট হারভেস্ট সংরক্ষণ পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।
খাদ্য সংরক্ষণ বলতে শুধু হিমাগারে সংরক্ষণ করাই বোঝায় না, তা প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমেও সংরক্ষণ করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের উৎপাদিত ফল বা খাদ্যপণ্যের উদ্বৃত্ত অংশ নানাভাবে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে রপ্তানি করে। যা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেয়। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। দেশের বাজারের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের বাজারও ধরার জন্য উদ্যোগী হতে হবে।
আমাদের স্মরণে আছে, করোনা অতিমারিকালে এবং তৎপরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দায় যখন পুরো বিশ্বই খাদ্যসংকটের আশঙ্কা করছে, তখন সেই বিপর্যয় মোকাবিলায় কৃষিই ছিল আমাদের ভরসা ও আস্থার জায়গা। আমাদের কৃষক সেই বীভ্ৎস অতিমারিকালেও পিছিয়ে আসেননি, বরং উদয়াস্ত পরিশ্রম করে মাঠে ফসল ফলিয়েছেন। ফলে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা থেকে আমরা মুক্ত থেকেছি, স্বস্তিতে থেকেছি। অথচ এই কৃষি এবং কৃষকই বারবার আমাদের অবহেলার শিকার। আমাদের কৃষিপণ্য উৎপাদনের সফলতা ধরে রাখতে হলে শুধু উৎপাদনই নয়, তাকে প্রক্রিয়াজাত করার উপায় না জানলে এবং তার প্রয়োগ না হলে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে না। একমুখী উৎপাদননির্ভরতা দিয়ে প্রতিযোগিতার বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন। এই সহজ সত্যটি আমরা যতক্ষণ না উপলব্ধি করব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কৃষি ও কৃষকও নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবেন। আমরা চাই এই বঞ্চনার কাহিনীর অবসান হোক।