× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

বিমান ক্রয় নিয়ে এন্তার প্রশ্ন

জিবলু রহমান

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৮ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বাংলাদেশ বিমান। ‘আকাশে শান্তির নীড়’- স্লোগান নিয়ে পরিচালিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য ২৫টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেওয়ার সংবাদে অনেকে হতবাক হয়েছেন। কাজটি সমাধা হয়েছে গোপনীয়তা বজায় রেখে। বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় তেমন আলোচনা নেই, তবে কয়েকটি সংবাদপত্র গুরুত্বসহকারে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ক্রয়াদেশের সত্যতা প্রকাশিত হয়েছে। 

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্য সচিব বলেছেন, ‘আমাদের ইমিডিয়েট কিছু এয়ারক্রাফট দরকার, দুয়েক বছরের মধ্যে দরকার, হয়তো আমরা দুয়েক বছরের মধ্যে কিছু বিমান পাব। আমাদের বিমানের তো বহর বাড়াতে হবে। সেই পরিকল্পনা সরকারের বেশ আগে থেকেই ছিল। আমরা এ বছরে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ইস্যুতে আবার নতুন করে এই আদেশগুলো দিয়েছি, আগে ১৪টা ছিল, পরে সেটা বাড়িয়ে ২৫টা করেছি।’

বিমান বাংলাদেশ ২৩টি আন্তর্জাতিক ও আটটি অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে। যাত্রী পরিবহন ও মালপত্র পরিবহন (কার্গো) বিমানের মূল কাজ। এর বাইরে বিমানের অন্যান্য সেবার মধ্যে আছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো হ্যান্ডলিং, বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার (বিএফসিসি), বিমান পোল্‌ট্রি কমপ্লেক্স (বিপিসি) ইত্যাদি।

বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। অতিরিক্ত ২৫টি বিমান যোগ হলে বিমানকে বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ নতুন ফ্লাইট চালাতে হবে, যা বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়। সংস্থাটিতে পাইলট, ক্রু ও প্রকৌশলীর সংকটও রয়েছে। বিমানের যাত্রী সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে ৪ থেকে ৬ শতাংশ হারে বাড়ছে, কিন্তু তা দিয়ে বিশাল বহরের ব্যয় পূরণ করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহর আরো বাড়িয়ে যদি সরকার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঢাকতে চায়, তাহলে সেটা হবে আত্মঘাতী। অবশ্য কোন ধরনের উড়োজাহাজ ক্রয় করা হচ্ছে, এগুলোর মূল্য বা কবে নাগাদ দেশে এসে পৌঁছবে, তা স্পষ্ট করেননি বাণিজ্য সচিব। বোয়িং চুক্তির অর্থ আসবে বিদেশি ব্যাংকের ঋণ, এক্সিম ব্যাংক ইউএসএর সহায়তা এবং আংশিক সরকারি ভর্তুকি থেকে। কিন্তু এত বড় ঋণ পরিশোধে বিমানের আর্থিক সক্ষমতা কতটা রয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা হয়নি। সরকার বলছে, নতুন চুক্তি বাংলাদেশের আকাশপথ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগকে আরও গতিশীল করবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ হিসাবপত্র বলছে ভিন্ন কথা, বিমান বর্তমানে ফ্লাইট পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে, লোকসানি রুট বন্ধ করতে পারছে না এবং কর্মী কাঠামো অতিরিক্ত ভারী।

দূরপাল্লার উড়োজাহাজ বহরে থাকার পরও বিমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তারা এর সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার টরন্টো, ইতালির রোম এবং জাপানের নারিতায় ফ্লাইট শুরু করে সংস্থাটি। এর মধ্যে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নারিতা রুটটি স্থগিত করা হয়। বিমানের দাবি, রুটটি পরিচালনা করতে মাসে তাদের অন্তত ২০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। অবশ্য টরন্টো এবং রোম ফ্লাইট নিয়ে এমন অভিযোগ নেই। যাত্রী না বাড়িয়ে, রুট না বাড়িয়ে, মুনাফা না বাড়িয়ে যদি নতুন ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে এটি ভবিষ্যতের জন্য ‘ঋণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়াবে।

আমেরিকার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে যেসব বিমান ক্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মূল্য তালিকাও অনেক বড়। জানা গেছে, ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারের মূল্য প্রায় ২৯২ মিলিয়ন ডলার এবং ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের মূল্য ১২১.৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের পছন্দের তালিকায় ১০টি ড্রিমলাইনার ও ১৫টি ম্যাক্স রয়েছে। সেই হিসাবে মোট মূল্য দাঁড়ায় ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাস্তবে বড় অর্ডারে ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যায়, তবু এই অঙ্ক প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। ২০২৩ সালে ফ্রান্সের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বলা হয়েছিল, বোয়িংয়ের চেয়ে কম মূল্যে, ভালো কোয়ালিটির এয়ারবাস বিমান ছিল সেগুলো। একই সঙ্গে বোয়িংয়ের সঙ্গেও কথাবার্তা চলছিল। প্রাথমিকভাবে এয়ারবাসের কাছ থেকে এ‑৩৫০ মডেলের দুটি উড়োজাহাজ ক্রয় করতে আগ্রহের কথা জানায় বিমান। আর বোয়িংও প্রস্তাব দেয় অন্তত ২টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিক্রির। তবে সরকার বদলের পর তা আর এগোয়নি। আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে বাংলাদেশ যে ফের বোয়িং কেনার ক্রয়াদেশ দিয়ে ফেলেছে, সে কথা বাণিজ্য সচিবই প্রথম সাংবাদিকদের জানান।

তবে এ ক্ষেত্রে ভয়ংকর তথ্য হলো- বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাঠগড়ায় বোয়িং। বোয়িং কোম্পানির বিমান সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১২ জুন আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১ বিধ্বস্তে ২৬০ জন নিহতের পর বোয়িং নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা। অবশ্য এটিই ছিল ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের প্রথম কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বিমানের মধ্যে ৭৭৭ ও ড্রিমলাইনারগুলো টানা ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় উড়তে সক্ষম। এ ধরনের উড়োজাহাজ লং হাউল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ৭৩৭ উড়োজাহাজগুলো মধ্যম ও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সময়ে হুইসেল ব্লোয়াররা বোয়িংয়ের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনিতেই বিভিন্ন দুর্ঘটনায় বোয়িংয়ের চাহিদা কমে গেছে, অথচ বাংলাদেশ এ বিমান ক্রয়ে আগ্রহী। সম্প্রতি বোয়িং ৭৮৭‑এর মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের সময় যখন বিমানের জন্য বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ অর্ডার করা হয়, তখন বিমানের পর্ষদের সদস্য ছিলেন কাজী ওয়াহেদুল আলম। ওই উড়োজাহাজগুলোই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করে বোয়িং। বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহেদুল আলম বলছেন, ‘এটা আদৌ বিমানের জন্য প্রয়োজন আছে কি না সেটা তো বিমানকে বলতে হবে।’ 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বরাবরই বলে আসছে, যে তারা লাভে চলছে। বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পাচ্ছে না। এয়ারলাইনস-বহির্ভূত বিমানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির (নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান) ব্যবসায় যে লাভ হচ্ছে, সেটাই বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। এটি সরাসরি এয়ারলাইনস ব্যবসা নয়। তবে এমন খাতের আয় দিয়েই মূলত লাভ দেখাচ্ছে বিমান। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস মোট ১০ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা আয় করেছে। এর মধ্যে নিট মুনাফার পরিমাণ ২৮২ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মুনাফার পরিমাণ ৮০০ কোটি ছাড়াবে বলে জানা গেছে। উড়োজাহাজের প্রয়োজন বিবেচনায় না রেখে ওপর থেকে এ-রকম ক্রয়াদেশ চাপিয়ে দেওয়াকে ‘অদ্ভুত’ বলছেন এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা। 

উড়োজাহাজের স্পেসিফিকেশন কী হবে, ফাইন্যান্সিয়াল স্পেসিফিকেশন কী হবে, রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট কী হতে পারে। একটা প্লেন আমি কিনব, কতদিনে সেই টাকা উঠবে ইত্যাদি সবকিছু পর্যালোচনা করে এই ফ্লিট প্ল্যানিং কমিটি একটা রেকমেন্ডেশন পাঠায় সেই এয়ারলাইনসের বোর্ডকে (পরিচালনা পর্ষদকে)। বোর্ড পরে পর্যালোচনা করে দেখবে যে এই প্রস্তাবটা কতটুকু সঠিক। বোর্ড যদি কেনার বিষয়ে ইতিবাচক হয়, তখন তারা বোয়িং ও এয়ারবাসের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোকে ডাকবে। তাদের কাছ থেকে দর চাইবে, প্রেজেন্টেশন দিতে বলবে। ফ্লিট প্ল্যানিং কমিটি কিন্তু বলবে না তারা কোন কোম্পানির উড়োজাহাজ কিনবে, তারা শুধু বলবে ওয়াইড বডি বা ন্যারো বডি লাগবে। এটা ঠিক করবে এয়ারলাইনের বোর্ড।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এটা সত্যি যে, বিমানের নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন। বিষয়টি এমন নয় যে, আজ অর্ডার করলে কাল উড়োজাহাজ চলে আসবে। কিন্তু এর পরিকল্পনাটা বিমানের তরফে হলেই ভালো হতো। কারণ তারাই বলতে পারবে তাদের কী ধরনের উড়োজাহাজ লাগবে, তাদের রুট প্ল্যানিংটা কী হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের (মার্কেট) শেয়ারে বিদেশি এয়ারলাইনসের আধিপত্য বেশি। বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলো মাত্র ২৫% নিয়ন্ত্রণ করে। এটা বাড়াতে হলে বিমানকে বহর বাড়াতে হবে। তবে সেটা হতে হবে পরিকল্পনামাফিক। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করলে এটা সফল হবে না। এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের কারণে দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে। এমনকি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও। 

বিমানের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াতকারী ভিভিআইপি, ভিআইপিরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিমানের অসাধু কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অথবা দেশীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যেকোনো সময় নাশকতা ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কার কথা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বহুবার উল্লেখের কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিমান কখনোই সোনা চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে রহস্যজনক কারণে তদন্ত করে না। কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও কর্মকর্তা পর্যায়ের অপরাধীরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

  • গবেষক ও কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা