তুলা ক্রয়-বিক্রয়
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩১ এএম
মো. ইলিয়াস হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে তাতে গত এক বছরে দেশের গার্মেন্টস শিল্পের ওপরে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার সংকট পুরো শিল্পকে একটি বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এমতাবস্থায়, এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে একটি স্থিতিশীল, শ্রমবান্ধব, নীতিনির্ধারক-সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ খুবই জরুরি। আমাদের জানতে হবে, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে শুধুমাত্র তৈরি পোশাক শিল্প থেকে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬.৯৯১ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮১.৮১ ভাগ। বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ২য় এবং শীর্ষ স্থানে রয়েছে চীন। গার্মেন্টস শিল্পের গোড়াপত্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কাঁচা তুলা, যেটি সুতা উৎপাদনের মূল উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাঁচা তুলা হলো তুলা গাছের বীজ থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক তন্তু, যা ফাইবার হিসেবে ব্যবহার হয়। এটি প্রক্রিয়াজাত করে সুতা উৎপাদন করা হয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান কাঁচামাল এই তুলা। যার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ মূলত ভারত, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং আফ্রিকা থেকে তুলা আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তুলা আমদাননিকারক দেশ। তৈরি পোশাক শিল্প তুলা আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আমদানির দিক দিয়ে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশের বছরে ১ কোটি ১৫ লাখ বেল অপরিশোধিত তুলা ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বর্তমানে ৮০ থেকে ৮৫ লাখ বেল কাঁচা তুলা ব্যবহৃত হচ্ছে। গত ২০২৩-২০২৪ বাণিজ্য বছরে বাংলাদেশ ৭৫ লাখ ৭৫ হাজার বেল কাঁচা তুলা আমদানি করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে তুলা আমদানি করা হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ভারতের ওপরে নির্ভর ছিল। কালক্রমে সেই উৎসের পরিবর্তন হয়েছে। চার/পাঁচ বছরের মধ্যেই সে স্থান দখল করে নিয়েছে আফ্রিকার দেশগুলো।
বর্তমান আমদানি করা তুলার ৫০ শতাংশেরই বেশি আসছে আফ্রিকা থেকে। আর এই কাজে বড় ভূমিকা রাখছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। ঋণদাতা এই সংস্থাটির অর্থায়নের সুবিধা কাজে লাগিয়ে আফ্রিকান রপ্তানিকারকরা মালয়েশিয়ার ক্ল্যাং বন্দরে ওয়্যারহাউস গড়ে তুলেছে। সেখান থেকেই বাংলাদেশের আমদানিকারকরা তাদের প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ তুলা আমদানি করে থাকে। ইতিপূর্বে ইরানের বন্দর আব্বাসে এই তুলা মজুদ করা হতো। পরবর্তীতে ইরানের ওপরে আমেরিকা কর্তৃক বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করায় ওই ওয়্যারহাউস সুবিধাটি মালয়েশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। বাংলাদেশ চাইলে এই একই সুবিধা চট্টগ্রাম অথবা মোংলা, এমনকি পায়রাবন্দর কর্তৃক প্রদান করা যেতে পারত। এই ধরনের একটি প্রস্তাবনা গত ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়েছিল, উক্ত সময়ে, তুলা ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মতামত গ্রহণ সাপেক্ষে সরকারের রাজস্ব বিভাগের মতামত গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে তা আর আলোর মুখ দেখে নাই। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। পলিসি সাপোর্ট পাওয়া যায় নাই অথবা উদ্যোগী সংস্থা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন পত্রালাপ অনুসন্ধান করলে নিশ্চয়ই এ-সংক্রান্ত অগ্রগতির তথ্য জানা যেতে পারে। তবে যাহোক, সুযোগ একেবারে চলে যায়নি। দেশের পোশাক শিল্পের উন্নতির স্বার্থে সরকার চাইলে মালয়েশিয়ার ক্ল্যাং বন্দরের আদলে বাংলাদেশের যেকোনো বন্দর এলাকায় একই সুযোগ-সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস গড়ে তোলা যেতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশে তুলার ওপরে শূন্য ট্যাক্স, সে ক্ষেত্রে বিদেশি রপ্তানিকারকদেরকে বন্দর এলাকার আশপাশে এই ধরনের ওয়্যারহাউস নির্মাণের আহ্বান করা যেতে পারে এবং একই সঙ্গে পণ্য খালাসে প্রয়োজনীয় পলিসি সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। এতে তুলা ব্যবহারকারী আমদানিকারকরা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধাসহ স্বল্প সময়ে প্রয়োজনীয় তুলা সংগ্রহ করতে পারবে। ফলে আমাদের সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক শিল্প প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে বিদেশি মালিকানাধীন কাঁচা তুলা মজুদের জন্য ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রদান করা হলে দেশীয় ব্যবসায়ী এবং টেক্সাইল মিলের মালিকরাসহ সার্বিক বিবেচনায় দেশের যে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭৫ লাখ ৭৫ হাজার বেল কাঁচা তুলা আমদানি করেছে, যা গত অর্থবছরেও ছাড়িয়ে যাবে। এখানে উল্লেখ্য, ১ বেল তুলার ওজন ২১৮ কেজি বা ৪৮০ পাউন্ড এবং প্রতি বেল তুলার গড় মূল্য ৩৬০ ডলার। বাংলাদেশ গত ২০২৪ সালে প্রায় ২.৭৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা আমদানি করেছে। উপরিউক্ত সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সৃষ্টি করা গেলে ওই পরিমাণ তুলা কোনো মূল্য পরিশোধ ব্যতিরেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ওয়্যারহাউসে প্রবেশ করবে, যা কেবল বৈদেশিক মুদ্রায় এলসি খুলে এক দিনের মধ্যেই স্পিনার্স মালিকরা তাদের কারখানায় কাঁচা তুলা নিয়ে যেতে পারবে। এতে বর্তমান এলসি খোলা, বিদেশ থেকে পণ্য জাহাজজাত করা, বন্দরে পণ্য খালাস এবং গুদামে পৌঁছানো ইত্যাদি কারণে অযথা অর্থ এবং সময়ক্ষেপণ প্রয়োজন হবে না। যেহেতু অল্প সময়ে কাঁচা তুলা আমদানিকারকদের গুদামে পৌঁছে যাবে, এতে অতিরিক্ত পরিমাণ তুলা স্টক/গুদামজাত করার প্রয়োজন হবে না। ফলে গুদাম ভাড়া, পরিবহন খরচ (বিদেশি ওয়্যারহাউস থেকে জাহাজে পরিবহন), এলসি খরচ, বীমা খরচ ইত্যাদি কমে যাবে। এতে পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। বিশ্ববাজারে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
বিশেষ কাঁচা তুলা জাহাজীকরণ, বন্দরে পণ্য খালাস, কারখানায় পরিবহন ইত্যাদি কাজে কখনও দেরি হয়ে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, অনেক ক্ষেত্রে শিডিউল মোতাবেক পোশাক তৈরি করাসহ রপ্তানি করা সম্ভব হয় না, ফলে রপ্তানি বাতিল হয়ে যায়। উৎপাদিত পোশাক স্টক লট হয়ে গেলে পোশাক রপ্তানিকারক বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমে যায়। জানা যায়, তুলা বছরে একবারই হারভেস্ট হয়। বিশ্বের বড় বড় তুলা সরবরাহকারী/ব্যবসায়ীরা উক্ত তুলা হারভেস্ট পরবর্তীতে কোনো সুবিধাজনক বন্দরে গুদামজাত করে রাখে এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী তা আবার জাহাজীকরণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে রপ্তানি করে। এতে একই পণ্য দুইবার জাহাজীকরণ এবং পরিবহন করতে হয়। ফলে তুলার মূল্য বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ওয়্যারহাউজিং করা গেলে হারভেস্ট পরবর্তী একবারেই তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গুদামজাত করা সম্ভব হবে। ফলে তুলার মূল্য অনেকটা কমে যাবে, যা পোশাক শিল্পে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস স্থাপন করা গেলে সার্বিকভাবে দেশের রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিসহ লজিস্টিক খরচ এবং সময়ক্ষেপণ হ্রাস পাবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষিত হবে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান হবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে আবির্ভূত হবে। এছাড়া এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস স্থাপন হলে তা শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বস্ত্রশিল্পের জন্য একটি কৌশলগত উদ্যোগ হতে পারে। তবে এই প্রস্তাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারিভাবে সম্ভাব্য যেসব পলিসি সাপোর্ট/ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে প্রথমেই মালয়েশিয়ার আদলে বাংলাদেশের যেকোনো পোর্ট/সুবিধাজনক এলাকায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী কর্তৃক ওয়্যারহাউস স্থাপনের অনুমতি দেওয়া এবং এর ব্যবস্থাপনা মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে মালামালের হিসাব সংরক্ষণের জন্য কাস্টমসের উপস্থিতিও প্রয়োজন।
পোশাক শিল্পে বর্তমানে আমদানিকৃত কাপড় এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী যেভাবে নির্ধারিত পাস বইয়ে লিপিবদ্ধ করে খালাস দেওয়া হয়, আমদানিকৃত কাঁচা তুলাও একই পদ্ধতিতে খালাস করার ব্যবস্থা করা। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ওয়্যারহাউসে মজুদ তুলার মালিকানা যেহেতু বিদেশি রপ্তানিকারক এবং এই তুলার ওপরে কোনো শুল্ক প্রযোজ্য নয়, সে ক্ষেত্রে কাস্টমস বন্ডেড ওয়্যার হাউসের প্রয়োজন হবে না। এমনকি কোনো এলসি না খুলে অথবা কোনোরকম মূল্য পরিশোধ ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর তুলা বাংলাদেশে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়া নির্দিষ্ট ওয়ারহাউসে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা।
কাস্টমস কর্তৃক ছেড়ে দেওয়া কাঁচা তুলা নির্দিষ্ট গুদামে মজুদ করা এবং ক্রেতা সাধারণ প্রচলিত নিয়মে পণ্যের মালিক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রায় এলসি খুলে গুদামজাত কাঁচা তুলা কিনে নিয়ে যেতে পারে সেই সুবিধা প্রদান করা। এতে সময় এবং গোডাউনে স্টক মজুদের পরিমাণ অনেক কম লাগবে। ফলে কারখানা মালিকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। গুদামজাত তুলার মালিকানা আন্তর্জাতিক সাপ্লাইয়ারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাংলাদেশের বাইরেও রপ্তানি করার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে একই পদ্ধতিতে নির্ধারিত পাস বইয়ে লিপিবদ্ধ করে তা রপ্তানি করতে পারবে। কারণ সকল ক্ষেত্রে তুলার ওপরে শূন্য শুল্ক বিদ্যমান।
বাংলাদেশে কাঁচা তুলার আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস স্থাপন করলে তা দেশের গার্মেন্টস খাতকে আরও টেকসই, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করবে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার কাঁচা তুলা বাণিজ্যে বাংলাদেশ একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারবে। এ ধরনের একটি হাব ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই বিবেচনা করার দরকার ছিল। তদুপরি, দেরিতে হলেও তুলা আমদানির ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত বিদেশি সরবরাহকারী কর্তৃক একটি আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। যেহেতু বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তুলা আমদানিকারক দেশ, সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এই ধরনের একটা ব্যবস্থা এখনও কেন করা হয়নি, সেটাই আশ্চর্য। তাই কালক্ষেপণ না করে অতি দ্রুততার সঙ্গে বর্ণিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেশের পোশাক শিল্পের স্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেÑ সেই দিনের অপেক্ষায় আমরা।