জাতীয় নির্বাচন
এম জে আবেদীন
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৭ এএম
ফাইল ফটো
এক বছর পার করল ইন্টেরিম সরকার। আকাশচুম্বী আশা নিয়ে ১৮ কোটি মানুষ ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ওপর যে পরিমাণ আশা-প্রত্যাশা করেছিল, তার কতটুকু পেয়েছে সে হিসাব মানুষ করা শুরু করেছে। যদিও এই সরকারের মূল কাজ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। সরকার ঘোষিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাকি আরও কমপক্ষে ৬ মাস। রমজান মাসের আগে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ভাগে যে নির্বাচনের ঘোষণা প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় দিয়েছেন তাতে রাজনৈতিক দলগুলো যেমন নির্বাচনের দিকে ঝুঁকবে তেমনি সাধারণ মানুষও অনেক দিন পর একটা সত্যিকারের নির্বাচনে নিজেদের ভোট দিয়ে পছন্দমতো সরকার গঠনে সক্ষম হবেন। এই নির্বাচন নিশ্চিতভাবেই দেশের জন্য একটি ইতিবাচক ভালো ফলাফল বয়ে আনবে বলে আমি মনে করি। তবে অতি অবশ্যই সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অপরিহার্য।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার শেষ জীবনে দেশের সর্বোত্তম কাজের স্বীকৃতি পাবেন কি না সেটা সময়ই বলে দেবে। একটা অবাধ ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারলে তিনি চিরস্মরণীয় হবেন। তবে আমরা মনে করি, এখন পর্যন্ত সংস্কার ও বিচারের উনি যা করতে পেরেছেন তা অন্য কারও পক্ষে করা সম্ভব হতো না। সংস্কারের বলতে গেলে সেন্ট পারসেন্ট প্রায় সব রাজনৈতিক দল মেনে নিয়েছে। যা খুবই আশাব্যঞ্জক। হাসিনাসহ মাফিয়াতন্ত্রের অনেকের বিচার অনেক দূর এগিয়েছে। আগামী ৬ মাসে ২/১টা রায় হতেও পারে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের দেশে ও বিদেশে মানুষ যে হাইট বা খ্যাতি তার সরকারের সঙ্গে সেটা মোটেই তুলনা চলে না। অতি দুর্বল একটা সরকার তিনি চালাচ্ছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উপদেষ্টাদের অর্ধেকের ব্যাপারে মানুষ সন্তুষ্ট বলে মনে করি না। তাদের যারাই মনোনীত করুক দায়িত্বটা প্রধান উপদেষ্টার ওপর বর্তায়। এদের অনেককে বাদ দেওয়া উচিত কিন্তু তারা পদত্যাগ যেমন করেননি তেমনি তিনি নিজেও তাদের যেতে বলছেন না! এটা হয়তো সরকার পরিচালনার অনভিজ্ঞতার ফল। তবে তার সফলতাও আছে। সরকারের সবচেয়ে সফলতা যেসব খাতে সেগুলো হলো অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভালো সফলতা দেখিয়েছে। হাসিনার মাফিয়াতন্ত্র যেভাবে আর্থিক খাত ধ্বংস করে দিয়েছিল সেটা পুনরুদ্ধার করা একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। এখানে সরকার অসাধারণ সফলতা দেখিয়েছে। তবে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে। স্বাস্থ্য খাত বা শিক্ষা খাতও তেমন কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি।
রাজনৈতিকভাবে পুরো একটা ভঙ্গুর দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং সবরকম ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগ হয়েছিল রাজনৈতিক হানাহানি এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের মতো দেশের চরম বৈরিতা এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য এবং ছাত্রদের একক কর্তৃত্বমূলক আচরণ, বিএনপির কতিপয় নেতার আস্ফালন এবং জামায়াতের নির্বাচন বর্জনের হুমকি তাকে কিছুটা ঝামেলায় ফেলেছিল। তা ছাড়া সরকারের ভিতরে ও বাইরে কতিপয় কুচক্রী নির্বাচন-বিরোধী তৎপরতার কারণে কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি সামান্য সময়ের জন্য হলেও দেখা দিয়েছিল। এজন্য এসব ইঁচড়ে পাকা গুটিকয়েকদের প্ররোচনায় এবং উনার সহজ-সরল মানসিকতার সুযোগে এক কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে পুরো জাতিকে। হাসিনার পতন ও পলায়নের পর এই কয়দিন ছিল খুবই অনিশ্চিত।
সেই সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ইন্টেরিম সরকারের বিরুদ্ধে কতিপয় বিএনপি নেতার আচরণে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চরম ক্ষুব্ধ হন। তাদের বাসায় ডেকে তিনি ভর্ৎসনা করেন। কোনো অবস্থাতেই ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে তিনি নির্দেশ দেন। তারেক রহমানকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে লন্ডন সফরকালে দেখা করতে বলেন। সব মেঘ কেটে যায় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবও বুঝতে পারেন এই কয়জন ছোকরা যেসব হুমকি-ধমকি দিয়ে এতদিন বাগাড়ম্বর করছিল তিনি তাদের আসল জনপ্রিয়তা এবং অবস্থান বুঝতে পারেন দেরিতে হলেও। ফলে তিনি সকল ধরনের রাজনৈতিক চালাকি বুঝতে পারেন। তিনি এটাও বুঝতে পারেনÑ একটা গণতান্ত্রিক এক্সিট প্ল্যান ছাড়া তার সরকার, সংস্কার এবং সকল কর্মকাণ্ডের বৈধতা না দিতে পারলে শুধু তিনি নন পুরা দেশের বারোটা বেজে যাবে। এজন্য সকল রাজনৈতিক দল বিশেষত, প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও সেনাবাহিনী ছাড়া এটা মোটেই সম্ভব নয়।অথচ এই কতিপয় ছাত্রনেতা নামধারী প্রধান দুই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
আমি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশ্বপরিক্রমায় যেভাবে দেখেছি, তার যে উইজডোম, সহজ সরলভাবে দেশকে দেখা, শত শত বছরের সেরা বাঙালি মুসলমান হিসেবে সারা বিশ্বের কাছে যেভাবে সমাদৃত তেমনি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের কাছে সেরকম হিসেবেই থাকবেন বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বটবৃক্ষের মতো এই মানুষটির কাছে যেসব বামুন বা পেরাজাইট কিলবিল করছে গত এক বছর যাবৎ তাদের বলি, ১০০টার বেশি বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে যার উদ্ভাবনী পড়ানো হয় এবং বিশ্বনেতারা যার সঙ্গে দেখা করার জন্য এখনও অপেক্ষা করেন তার সঙ্গে আর যাই কিছু কর চালাকি বা ধূর্তামি করে পার পাওয়া যাবে না। তিনি যেভাবে দেশকে দেখেন তার ধারেকাছেও কেউ নেই। কারণ তিনি সহজ-সরল বটে কিন্তু শত শত বছরের বুদ্ধিমানদের একজন।
তাই তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়ার মতো বঙ্গোপসাগরে আরেকটি দেশ দেখতে পান যেটা আমাদের একান্ত দরকার। কোনোদিন আমাদের তরুণেরা প্রেসিডেন্ট জিয়া ও ড. ইউনূসের দেখানো পথে সমুদ্রের ব্লু ইকোনমির দিকে নজর দেবে এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকৃতি প্রদত্ত বিশাল সম্পদকে কাজে লাগাতে পারবে। আমি বাংলাদেশের এই ক্রান্তিকালে এবং মানুষের স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়া এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্মিলিত ভূমিকা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করি এবং বাংলাদেশের এই দুই পরম শ্রদ্ধাভাজন মানুষের দীর্ঘায়ু কামনা করি।