শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৭ এএম
বিশ্ববাণিজ্য এখন আর শুধু পণ্য কেনাবেচার বিষয় নয়। এটি পরিণত হয়েছে জিও-অর্থনৈতিক অস্ত্রব্যবস্থায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার সেই অস্ত্রধারীর ভূমিকায় ফিরে এসেছেন। চীনের পর এবার তার নিশানায় পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমনির্ভর রপ্তানিকারক দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা নির্দিষ্ট পোশাক পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশি শিল্প খাতের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি। তবে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমে ২০ শতাংশে নামানো সম্ভব হয়েছে।
বর্তমান বিশ্ববাজারে বাণিজ্য নীতিমালা শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যম নয়, বরং এটি জিও-রাজনৈতিক এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে, বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেশগুলো বাণিজ্য শুল্ক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই শুল্ক বৃদ্ধি নীতিও একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল। তার ভাষায়, ‘আমরা আমেরিকান পণ্য, কাজ ও করদাতাদের রক্ষা করছি,’ যা মূলত তার ২০২৪ সালের নির্বাচনের জন্য ঘরোয়া কর্মসংস্থান এবং দেশীয় উৎপাদন শিল্পকে চাঙ্গা করার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। এই নীতির ভিত্তিতে কম খরচে আমদানিকৃত পণ্য যেমন বাংলাদেশের পোশাক খাতকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক জটিলতার সৃষ্টি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববাণিজ্য-ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের শুল্ক বাড়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও আলোচনার ক্ষেত্রে গৃহীত কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অলিগলিতে বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সক্রিয়তার কারণে শুল্ক হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো সম্ভব হয়েছে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক জয় নয়, বরং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকার নিরাপত্তার এক সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় খাত হওয়ায়, এই সাফল্য জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও কার্যকর প্রতিনিধিত্বের প্রতিও বিশ্বমঞ্চে ইতিবাচক বার্তা গড়েছে। তবে, এই সাফল্যের পিছনে যেমন উৎসবের মুহূর্ত রয়েছে, তেমনি সামনে আরও কঠিন সময় ও নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। বাণিজ্যের এ যুদ্ধে স্থায়ী সাফল্য কেবল ধারাবাহিক কূটনীতি, কৌশলগত পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরই নির্ভরশীল।
শুল্কহার কমে ২০ শতাংশে আসায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারলেও, এখানেই থেমে থাকা যাবে না। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই কঠোর হচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সময় আরও সক্রিয় ও কৌশলগতভাবে মার্কিন ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার। মনে রাখা দরকার, শুল্ক কমলেও তা আমদানিকারীদের ওপর চাপ কমায় না; বরং মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েই চলেছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ায়। এজন্য পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল সুষ্ঠু রাখা এবং ব্র্যান্ডদের সঙ্গে শক্তিশালী চুক্তি করা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে ট্যারিফের প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। তাই ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি। সচেতনতার মাধ্যমে অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে আয়-ব্যয় পর্যালোচনা ও বাজেট মেনে চলা : নিজের আর্থিক অবস্থা বুঝে নিয়মিত আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে হ্রাস করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা : নেতিবাচক সংবাদ থাকলেও পরিকল্পিত বিনিয়োগ বন্ধ করা উচিত নয়। এটি ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। আর আর্থিক পরিস্থিতির নিয়মিত মূল্যায়ন : নিজস্ব আর্থিক অবস্থান যাচাই করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিতে হবে, যাতে ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হয়।
এজন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন ও যৌথ পর্যালোচনা ফোরাম গঠন করতে হবে। অংশীদারত্ব শর্তসাপেক্ষ ও জাতীয় স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। একক পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিজাত পণ্য, ওষুধ, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিকাশে মনোযোগ দিতে হবে। নতুন বাজারে প্রবেশ ও বিদ্যমান বাজার মজবুত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাণিজ্যে এখন কেউ কারও বন্ধু নয়; সবাই নিজের স্বার্থ রক্ষা করছে। ট্যারিফের এই জটিল খেলায় বাংলাদেশ আপাতত কিছুটা লাভবান হলেও সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। শুল্ক কূটনীতি, বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ও বিকল্প বাজার অনুসন্ধানের ওপরই নির্ভর করবে আমাদের টিকে থাকার গল্প।