হৃদয় পান্ডে
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৬ এএম
বাংলাদেশের সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা এক দাবি নিয়ে আন্দোলনের পথে। দাবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির পরিবর্তে পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বীকৃতি, একটি স্বতন্ত্র প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো কিংবা বিআইটি (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) মডেলে পুনর্গঠন। এই দাবির শিকড় অনেক গভীরে, বহু বছরের অসন্তোষ, অব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রোথিত। এসব কলেজ মূলত বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে উচ্চমানের প্রকৌশল শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, রাজধানীকেন্দ্রিক প্রকৌশল শিক্ষার একচেটিয়া অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে প্রান্তিক ও জেলা শহরভিত্তিক শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রাতিষ্ঠানিক মান নিশ্চিতকরণ, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, অধিভুক্তির ফলে প্রশাসনিক কাঠামো জটিল হয়ে পড়েছে। নানাবিধ সমস্যার ফলে কলেজগুলোতে শিক্ষাগত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন মানসিকভাবে চাপে থাকে, অন্যদিকে তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
লক্ষণীয় বিষয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক প্ররোচনায় নয়, ন্যায্য ও বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তারা শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমেছে, মানববন্ধন করেছে, স্মারকলিপি দিয়েছে, শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়েছে এবং ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করেছে। প্রশ্ন হলোÑ এই ছাত্রসমাজ যদি একদিন দেশের টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে চায়, তবে তাদের এখনই কাঙ্ক্ষিত কাঠামো ও পরিচয় দেওয়া উচিত নয় কি?
শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত বিকল্প কাঠামোটি মূলত বিআইটি (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) মডেলের ভিত্তিতে তৈরি। বিআইটি ছিল এমন এক মডেল, যেখানে প্রশাসনিক স্বতন্ত্রতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতা বজায় রেখে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় মানসম্পন্ন একটি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই বিআইটি-ই রূপান্তরিত হয় দেশের চারটি প্রধান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট)। ফলে বিআইটি মডেল কেবল একটি কাঠামোগত চিন্তা নয়, একটি সফল বাস্তব উদাহরণও বটে। বিআইটি মডেলে কলেজগুলো স্বতন্ত্র প্রশাসন দ্বারা পরিচালিত হতো, পাঠ্যসূচি নির্ধারণ হতো শিক্ষকদের নিজস্ব কমিটির মাধ্যমে, এবং গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম চালানো হতো উন্নয়ন প্রকল্প ও শিল্প সহযোগিতার ভিত্তিতে। এই ধরনের কাঠামো একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ রাখত না, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রকল্প-ভিত্তিক কাজের মাধ্যমে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দিত। শিক্ষার্থীদের দাবি, বর্তমান অধিভুক্তি ব্যবস্থায় এই স্বাধীনতাগুলো প্রায় অনুপস্থিত। তবে কিছু বিরোধিতাও উঠে এসেছে এই প্রস্তাবের বিপরীতে। কেউ কেউ মনে করেন, নতুন একটি প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো তৈরিতে সময় এবং সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে, যা এখনই সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে পরিচালনা করা কঠিন। আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, স্বতন্ত্র কাঠামোর মধ্যে শিক্ষার মান রক্ষা ও নজরদারির অভাবে ভবিষ্যতে গুণগত অবনমন ঘটতে পারে।
বাস্তবতা হলো, বিআইটি মডেলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান চারটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে এই মডেল সময়োপযোগী, কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব একেবারে নাকচ করে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। এ নিয়ে একটি জাতীয় পর্যায়ের আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত রূপকল্প নির্ধারণ করা দরকার। এই প্রেক্ষাপটে, বর্তমান সংকটের সমাধান হিসেবে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবেই ফিরে এসেছে। প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা, শিক্ষাকার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং আন্তর্জাতিক মানের ইঞ্জিনিয়ার তৈরির লক্ষ্যে এটি হতে পারে সময়োপযোগী একটি সংস্কার।
সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে যদি উদাসীনতা ও জটিলতায় ডুবিয়ে রাখা হয়, তাহলে তা হবে রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের দায়িত্ব শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, সেই নীতির বাস্তবায়নে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা নিশ্চিত করা। সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও যৌক্তিক দাবির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে, তখন সেটি শোনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রযন্ত্রের উচিত হবে, এই দাবিকে অবজ্ঞা না করে, একটি গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। অধিভুক্তি বাতিল করে যদি বিআইটির মতো স্বাধীন, গবেষণাকেন্দ্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোর প্রবর্তন করা যায়, তবে সেটি হবে রাষ্ট্রের এক দূরদর্শী পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি সমস্যার সমাধান নয়, একটি সম্ভাবনার বাস্তবায়ন যেখানে দেশ তার ভবিষ্যতের প্রকৌশল নেতৃত্ব গড়ে তুলবে, নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাবে এবং বিশ্বদরবারে নিজেকে একটি টেকসই প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরবে।