অর্থনীতি
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৪ এএম
নিরঞ্জন রায়
আমি ব্যাংক, ফাইন্যান্স এবং অর্থনীতির অনেক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করি জন্যে অনেকেই অনেক বিষয় জানতে চায় এবং অনেক বিষয় নিয়ে লিখতেও বলেন। সবার সব বিষয় নিয়ে লেখা সম্ভব না হলেও, কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে লেখার চেষ্টা করি। সম্প্রতি কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন বলে জানিয়ে এই বিষয়টি নিয়ে লিখতে বলেছেন। যে কয়জন ব্যবসায়ী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তাদের সবার সমস্যা একই রকম। তারা নানামুখী সমস্যায় পড়ে নিজেদের তৈরি করা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। দু-একজন পারিবারিকভাবে বাপদাদার হাতে গড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি নাÑ সেই শঙ্কায় পড়েছেন। তাদের একটাই কথা যে যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের সহযোগিতা করা না হয়, তাহলে তারা এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন না।
আসলে ছোট হলেই যত সমস্যা। তা সে বাড়ির ছোট ছেলে বা অফিসের ছোট কর্মকর্তা বা ছোট ব্যবসায়ীই হোক না কেন, তাকে নানান সমস্যা এবং জটিলতা মোকাবিলা করেই টিকে থাকতে হবে। যে ছোট, তাকেই সব আদেশ-নির্দেশ পালন করতে হবে, সবার মন জয় করে চলতে হবে এবং সবার উপদেশও শুনতে হবে। এ কথা ঠিক যে ছোটরা আদর ভালোবাসা একটু বেশিই পায়, কিন্ত এর বিপরীতে তাদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেড়ে যায়। এই অনুভূতির বিষয়গুলো মানুষের ব্যক্তিজীবনে যত না সমস্যা সৃষ্টি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যা ও জটিলতার সৃষ্টি করে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্যে আবেগ বা অনুভূতির কোনো স্থান নেই। ফলে বাস্তবতা মেনেই ছোট বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সমাজে ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়, গ্রাহকদের মন জয় করতে হয়, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকতে হয় এবং কিছু উপার্জন করে নিজে বাঁচতে হয়।
আধুনিক অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গুরুত্ব অপরিসীম। উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ক্ষুদ্র ব্যবসা খুব সহজেই শুরু করা যায়। এই ব্যবসার জন্য খুব বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয় না। তেমন কোনো অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হয় না। ফলে যে কেউ চাইলে খুব অনায়াসে এই ধরনের ব্যবসা চালু করতে পারে। এ কারণেই ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধরনের ব্যবসা ক্ষুদ্র হলেও অর্থনীতিতে এর ভূমিকা অনেক বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা উৎপাদনকারী যেসব পণ্যসামগ্রী উৎপাদন বা আমদানি করে, তা ভোক্তার কাছে পৌঁছার কাজটা করে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারে, তাহলে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের আমদানি বা উৎপাদিত পণ্য সেভাবে বিক্রি করাই সম্ভব হবে না। ফলে দেশের অর্থনীতিই সামগ্রিকভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়ে যায়।
অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও এই ক্ষুদ্র ব্যবসা সেভাবে সহযোগিতা পায় না। দেশের অর্থনীতি এবং রাজনীতি যখন স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে তখন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সেভাবে বিভিন্ন মহল থেকে সহযোগিতা না পেলেও তাদের ব্যবসা ভালোভাবেই চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকে, তখন তাদের সমস্যার মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। অস্বাভাবিক অবস্থায় অবশ্য ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীরাই সমস্যার মধ্যে থাকেন। কিন্তু বৃহৎ ব্যবসায়ীরা সমস্যা কাটিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে এটা সম্ভব হয় না। ফলে দেখা যায়, একটি দেশের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ঝড়ে অনেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এখন সে রকম অবস্থাই দাঁড়িয়েছে।
প্রায় এক বছর হতে চলল আমাদের দেশে রাজনৈতিক ঝড় শুরু হয়েছে, যা থামার লক্ষণ এখনও সেভাবে দৃশ্যমান নয়, যদিও আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক উত্থান-পতন একেবারেই নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা মাঝেমধ্যে ঘটে এবং অনেক দেশেই ঘটে। আমাদের দেশেও অনেক ঘটেছে। আর অর্থনৈতিক উত্থান-পতন তো নিয়মিত বিরতি দিয়েই ঘটে থাকে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণত একসঙ্গে দেখা যায় না। যখন দেশে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার জন্য। আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে রাখা হয়, যাতে করে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একই সঙ্গে দেখা, তখন এক চরম অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখান থেকে খুব সহজে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হয় না। এরকম অবস্থায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সকল ব্যবসায়ীই সংকটে পড়ে যায়। আর এই সংকটের মাত্রা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়। ঠিক এরকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে আমাদের দেশে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আবার দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এই ক্ষতির প্রভাব বেশি পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত। প্রথমত, আগের তুলনায় এখন তাদের বিক্রির পরিমাণ অনেক কমে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তাদের বাকিতে বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায় করতে পারছে না। উল্লেখ্য, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিক্রির বড় একটি অংশ বাকিতে হয়ে থাকে। এবং এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী হওয়ায় গ্রাহকরা বেশ পরিচিত। ফলে বাকির টাকা আদায়ে সেভাবে কঠোর পদক্ষেপও নিতে পারে না। তা ছাড়া তাদের অনেক গ্রাহক আর্থিক কষ্টে থাকায় বাকির টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। এই অবস্থা জানা থাকার কারণেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেক সময় গ্রাহকদের ওপর নির্দয় বা কঠোর হতে পারে না। তা ছাড়া গ্রাহকরা নিজে থেকে বাকির টাকা পরিশোধ না করলে বারবার তাগাদ দেওয়া ছাড়া ব্যবসায়ীদের আর কিছুই করার নেই।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিজেদের পাওনা টাকা আদায় করতে না পারলেও, তারা যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য ক্রয় করে, সেই টাকা পরিশোধের চাপে থাকে সব সময়। এই অর্থ পরিশোধ করতে যেয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মক সমস্যায় পড়ে যায়। এর ওপর আছে ব্যাংকঋণের সমস্যা। ব্যাংক থেকে এখন আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ প্রদান করা হচ্ছে না বললেই চলে। এসব ব্যবসায়ী দিনের পর দিন ব্যাংকের কাছে ধরনা দিয়েও ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নিতে পারছে না। উল্টো যেসব ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে রেখেছে, তারাও ঋণ পরিশোধের চাপে আছে। অনেকেই ঋণের সুদ বা কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চলছে অস্বাভাবিক অবস্থা, অথচ ব্যাংকের ঋণ প্রদানের অবস্থা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়েও কঠোর। এর ফলে অনেক ব্যবসায়ীর ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ খেলাপি হতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা আসলেই বেশ খারাপ। এই অবস্থা যদি আরও কিছুদিন চলতে থাকে তাহলে অনেক ব্যবসায়ীই তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে বেকারের খাতায় নাম লেখাবেন। এবং এই সংখ্যা যদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় তাহলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আবার বিশেষ সহায়তা প্রদান করা না হলে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এই সংকট থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। এই সহযোগিতা আসতে হবে বিভিন্ন মহল থেকে। একদিকে সরকার যেমন সহযোগিতা প্রদান করবে, অন্যদিকে তেমনি বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও নীতি সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।
ব্যাংক থেকে নেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণের শ্রেণিবিভাগের ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করা প্রয়োজন, যাতে করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ খুব বেশি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না হয়। এতে দুটো লাভ হবে। প্রথমত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবেন না। এর ফলে তাদের ব্যাংকিং লেনদেনে কোনোরকম সমস্যা হবে না। দ্বিতীয়ত, এই বিশেষ সুবিধার কারণে ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কম হবে। বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা সরবরাহকারী, যারা বাকিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহ করেন, তারাও এসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকির টাকা আদায়ে একটু বেশি সময় দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। প্রয়োজনে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যাতে ইনভয়েস ডিসকাউন্ট করতে পারে সেই সুযোগ রাখার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ পায় সেই সুযোগও অবারিত করা যেতে পার। প্রয়োজনে ইনস্যুরেন্স প্রডাক্ট কোল্যাটারাল হিসেবে প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরকম আরও অনেক পদক্ষেপ আছে, যা ব্যাখ্যা করতে গেলে এখানে স্থান সংকুলান হবে না। মোটকথা, দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রদান করার কোনো বিকল্প আপাতত নেই।