সাক্ষাৎকার// বাহাউদ্দিন শুভ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৮ পিএম
আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৮ পিএম
বাহাউদ্দিন শুভ
বাহাউদ্দিন শুভ। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক। বিগত আওয়ামী দুঃশাসনের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তার ছিল সরব উপস্থিতি। তারই ধারাবাহিকতায় চব্বিশে শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত কোটা সংস্কারের দাবিতেও তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে তিনি একান্তে কথা বলেছেন। জুলাই আন্দোলনের পটভূমি ও আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে তার মূল্যায়ন হুবহু তুলে ধরা হলো-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে প্রথম যখন জুলাই আন্দোলন শুরু হলো, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিলাম। আমরা আসলে বোঝার চেষ্টা করছিলাম এবং তাদের যে কথা ছিল, তার প্রতি আমরা সহমতও ছিলাম। সে স্থানে আমরা যুক্ত করার চেষ্টা করছিলাম যে কোটা বাতিল নয়Ñ সংস্কারের প্রয়োজন। যে মাত্রায় কোটা ছিল, সেটাও এক ধরনের বৈষম্য আবার কোটাকে যেভাবে বাদ দেওয়ার আলাপ আসছিল, সেটাও এক ধরনের বৈষম্য। কোটা বাতিল কিংবা বহাল কোনোটার পক্ষেই আমরা ছিলাম না। অর্থাৎ ন্যূনতম একটা সংস্কারের পক্ষে ছিলাম।
জেলার সাংগঠনিক শক্তির বিচারে আমরা সারা দেশের আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া আমাদের যে সকল বন্ধুপ্রতিম বাম সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। বিশেষ কিছু জেলা যেমন ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ অঞ্চলের ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ সর্বপ্রথম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্ম সামনে রেখেই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা অঞ্চলের যে আন্দোলন হয়েছে, এ আন্দোলনে আমাদের কর্মীরা প্রথম থেকেই ছিল। প্রথম থেকে যখন কোটা বাতিলের আলাপ ছিল তখন এ আন্দোলনকে যাতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নিয়ে যাওয়া যায়, সেখানেই ছাত্র ইউনিয়ন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। জুলাই-আগস্ট জুড়ে আমাদের যে সাংগঠনিক শক্তি, তাতে কোনো রকম কার্পণ্য ছাড়া সকল শিক্ষার্থী ও সকল শরিকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি।
অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে অনেক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। আমরা যদি সুনির্দিষ্টভাবে বলি ইসলামী ছাত্রশিবির তাদেরকে হয়তোবা ওইভাবে চেনার উপায়ও ছিল না। তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরে লুকায়িত ছিল। মানুষজন এখন নানাভাবে ট্রলও করেÑ আমি এগুলো বলতে চাচ্ছি না। তারা হয়তোবা অভ্যুত্থানে ছিল কিন্তু আন্দোলনের সময় কোন লেয়ারে ছিল, সেটা আমরা টের পাই নাই। আমরা যারা দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক রাজনীতি করেছি, প্রগতিশীল সংগঠন করেছি, আমরা পরস্পর চিনতাম। তাদের সঙ্গে আমাদের বিভিন্নভাবে আলোচনা হয়েছে। যারা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ইসলামী ছাত্রশিবির, যারা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের স্টেক নেবার আলোচনা করছেন। তাদের ব্যতীত অন্যান্য যে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছিল, যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন; বিশেষত ছাত্রশক্তি নামে একটি সংগঠন- যেখানে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদরা ছিল, তাদের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ ছিল। পুরো জুলাই-আগস্ট সারা দেশে যেখানেই আমাদের ছাত্র সংগঠন ছিল, আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়াই করেছি।
মানুষের প্রতিনিয়ত যে চলার অভ্যাস, তার সংস্কৃতি, তার খাদ্যাভ্যাস নানা ধরনের বৈচিত্র্য নিয়ে এই জনপদ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিশেষত মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক বন্ধুদের লড়াই ছিল এবং এর পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের সভা-সমাবেশ ছিল। শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার জন্য সাংস্কৃতিক যে লড়াইÑ সে লড়াই দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের মাঝে অব্যাহত ছিল। ৩ জুলাই শহীদ মিনার থেকে এক দফার ঘোষণা আসেÑ ওইদিন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের শাওন কুমার রায়ের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের শিল্পীদের বিশাল একটি অংশ অংশগ্রহণ করে। অভ্যুত্থান জুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে গ্রাফিতি হয়েছে, রাস্তায় আর্টওয়ার্ক হয়েছে, দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের চিত্রকর্ম হয়েছে, সেখানে আমাদের যে সকল শিল্পী, সাহিত্যিক আছেন, তারা রাজপথের লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন।
আমাদের সহযোদ্ধা মাহমুদুল হাসান রিজভী ১৮ জুলাই উত্তরায় নিহত হয়েছেন এবং ৫ তারিখ হাসিনা সরকারে পতনের পর মানিকগঞ্জের রফিকুল নিহত হয়েছেন। আমরা ধারণা করি, আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে আমাদের রফিকুলের ওপর পতিত আওয়ামী লীগের কর্মীরা সর্বশেষ আঘাত হেনেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের দুজন শহীদ এবং অসংখ্য কর্মী আহত হয়েছেন। আমরা সংগঠন করি আসলে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য। শিক্ষার্থীরা যদি আমাদের দাবি কোনোভাবে বুঝতে না পারে, আমরা যদি শিক্ষার্থীদের দাবি বুঝতে না পারি, তাহলে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। সে জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের যে মনের বাসনা, আমরা সেটি বোঝার চেষ্টা করেছি। এই আন্দোলনে যদি বলি যারা কারিগর বা কুশীলব, তারা হলো এই জনপদের শিক্ষার্থী, এই জনপদের শ্রমিক-মেহনতি মানুষ। আমরা হয়তোবা দায়িত্বের কারণে, দীর্ঘ সময় যাবৎ এই আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যেহেতু লড়াই করেছি এবং আওয়ামী দুঃশাসন ভেঙে দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সংগ্রাম আমরা করেছি। সে জায়গা থেকে সাংগঠনিকভাবে আমরা যতটুকু পেরেছি, ততটুকু লড়াই আমরা অব্যাহত রেখেছি।
অনুলিখন : শাহরিয়ার ইমতিয়াজ
বাহাউদ্দিন শুভ, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন