ড. আদিল মুহাম্মদ খান
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৩৩ পিএম
ড. আদিল মুহাম্মদ খান
চব্বিশের জুলাইয়ের শুরুর দিকে রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক কিছু শিক্ষার্থী কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। তখন সাধারণ মানুষের বেশিরভাগের পক্ষেই কল্পনা করা কঠিন ছিল সামনের দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে। এই জুলাই মাস যে অনেক দীর্ঘ হতে যাচ্ছে, তা-ও তখন অনুমান করা যায়নি। এখন আমরা জানি, দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই একত্রিশ দিনের নয়। সেটা ছিল ঠিকঠাক ছত্রিশ দিনের। দীর্ঘ দেড় যুগের ফ্যাসিবাদের নিচে চাপা পড়া আমাদের মুক্তির নতুন ভোর এনেছে জুলাই। কত আত্মত্যাগ আর রক্তস্নাত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আমাদের এই মুক্তির পথে।
বাংলার জমিনে কোনো স্বৈরাচারী সরকারই খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না- দৃঢ় বিশ্বাস থেকে এই কথাটি বিভিন্ন সময়ে অনেক নিকটজনকেই বলেছি। তখন স্বৈরাচারী সরকারের সময়। অনেকেই তখন ধরেই নিয়েছিলাম, স্বৈরাচারী শাসন, বাক-স্বাধীনতাহীন পরাধীনতাই হয়তো আমাদের নিয়তি। তাদের বলতাম, বাংলার নরম ও সমতল জমিন আর অগণিত মানুষ যখন বিদ্রোহ করবে, তাদের দমানো অসম্ভব। রাইফেল, বুলেট আর হেলমেট লীগ দিয়ে এই দ্রোহকালের মানুষের বাঁধকে ঠেকানো যাবে না।
আমরা শুধু অপেক্ষা করছিলাম একটা স্ফুলিঙ্গের। ময়দান প্রস্তুতই ছিল। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আর অধিকারের পক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাঙ্গনে কোটা আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। এদিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্রদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়াতে থাকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামার পর ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ১৫ জুলাই হামলা চালায়। সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সেদিন রাতভর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ, পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়।
সে রাতেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রতিরোধে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পিছু হটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালাতে বাধ্য হয়। কোটা আন্দোলনসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে তাই ১৫ জুলাই রাতটি এক ঐতিহাসিক সময়চিহ্ন। এ রাতেই বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনেও শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাস আর ভয়ের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেদিন রুখে দাঁড়ায়। আমাদের জুলাই বিপ্লবের বিজয়ের বীজ রোপিত হয়েছিল সে রাতেই।
পরদিন ১৬ জুলাই উদ্দাম দুহাতে আবু সাঈদের মৃত্যুকে আলিঙ্গন জুলাই বিপ্লবকে নিয়ে যায় ভিন্ন মাত্রায়। তখন ছাত্র-জনতার সামনে ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি ছিনিয়ে আনা ভিন্ন অন্য কোনো পথ ছিল না। আর তাই এর পরপরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। এরই মধ্যে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতার মসনদ রক্ষায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালাতে শুরু করে। তবে সরকারের পতন-ঘণ্টা ততক্ষণে বেজে গেছে। মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার ৯ দফা পরিণত হয় সরকার পতনের ১ দফায়।
অবশেষে ৩৬ জুলাই এসেছে আমাদের সেই শুভদিন। সহস্র নাম-না জানা শহীদের রক্ত দিয়ে লেখা আমাদের জুলাই বিপ্লবের অমর কাব্যগাথা। অজস্র মৃত্যু, অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ব, বৈধব্য, সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, এতিম শিশুর বোবা কান্না, মেশিনগানের গুলির সামনে ছাত্র-জনতার উদোম বুক, ট্যাংকের সামনে তরুণ-তরুণীর মুষ্টিবদ্ধ হাত, নাম-না জানা শহীদের গণকবর, ইটভাটায় পোড়ানো আমাদের সন্তানদের অঙ্গার হওয়া দেহ। এই রক্তগঙ্গার পথ পেরিয়েই অবসান হয়েছে স্বৈরশাসনের। এসেছে নতুন ভোর!
অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)