ফেব্রুয়ারিতে ভোট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
অবশেষে বিভিন্ন মহলের জল্পনা-কল্পনা ও সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে রোজার মাসের আগে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমনটিই বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ৫ জুলাই, মঙ্গলবার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠাব, যেন নির্বাচন কমিশন রমজানের আগে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।’ তিনি গত এক বছরে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেছেন, আমাদের সর্বশেষ দায়িত্ব পালনের অংশ নির্বাচন অনুষ্ঠান। উল্লেখ্য, গত মে মাসে লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, সংস্কার ও বিচার দৃশ্যমান হলে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন হতে পারে। এবার প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট করেই বলেছেন, রোজার আগে নির্বাচন হবে। সেই যৌথ বিবৃতির প্রতিশ্রুতি, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে কঠোর শ্রম দিয়েছে সে বিষয়গুলো উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতার বিষয়টিও উঠে এসেছে তার বক্তব্যে। তিনি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখরভাবে একটি সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন। তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা শঙ্কা, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক বির্তকের আপাত অবসান ঘটল। আপাত বলছি এই কারণে যে, এটা মূলত সম্ভাব্য সময়। ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষিত হয়নি। তারপরও গণতন্ত্রপ্রত্যাশী দেশবাসী এটি তাদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘ধাপ উত্তরণ’-এর পথ হিসেবে দেখছেন।
এ কথা স্বীকার্য যে, গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হচ্ছেÑ একটি পরিচ্ছন্ন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক উপায়ে ‘নির্বাচনী ব্যবস্থা’কে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। বিগত ১৫ বছরে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে অনেকটা একদলীয় ধাঁচের আওয়ামীপ্রথা চালুর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা গর্জে উঠেছিল ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দেশের মানুষ আবারও নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের উচিত জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করা। স্মর্তব্য যে, গত ১৫ বছরে সকল জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশের জনগণ এবং গণতান্ত্রিক বিশ্ব প্রশ্ন তুলেছিল। দিনের ভোট রাতে করা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের নিয়ে সরকার গঠন এবং ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচনের অভিধায় ভূষিত এসব নির্বাচন বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো মেনে নিতে পারেনি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের উচিত সেই নিন্দিত ও ঘৃণিত বাস্তবতাকে সামনে রেখে আগামীর নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি নেওয়া।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে একটি প্রতিনিধিত্বশীল জনগণের নির্বাচিত সরকারের জন্য কাজ করছে। সেই লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন গত এক বছর সংস্কার, নির্বাচনী বিধিবিধানের কঠোর প্রয়োগ, দেশের তরুণসমাজ এবং প্রবাসীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র সংস্কারে অংশীদার করার কাজ করে আসছে। নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিধিমালায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ, বিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও প্রচার প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারের নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ভোটার তালিকায় এবার ৪৪ লাখ ৬৬ হাজার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যারা নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্য হয়েছে, তারাও তালিকায় আসবে। ইতোমধ্যে আগামী নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্যও কাজ করছে। প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশন ৩৯টি সংসদীয় আসনে সীমানা পরিবর্তনের খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিবন্ধন পাওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে ১৪৪টি নতুন রাজনৈতিক দল। নির্বাচনসহ অন্যান্য খাতে নির্বাচন কমিশনের জন্য জাতীয় বাজেটে দুই হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা ইতোমধ্যে বরাদ্দ রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই বরাদ্দের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনও রয়েছে। কমিশনের প্রস্তুতির বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্প্রতি বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা একটা ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল ইলেকশন জাতিকে উপহার দিতে পারি, সেই লক্ষ্যেই আমরা প্রস্তুতিটা নিচ্ছি।’
ভোট দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। নাগরিকের দায়িত্ব হচ্ছে, কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়া। সবাই যাতে ভোটকেন্দ্রে আসেন এবং ভোট দেন, সেজন্য নির্বাচন কমিশন তথা সরকার, রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখতে হয়। অতীতে নিরপেক্ষ ও অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত রয়েছে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালÑ যেখানে সবার সহযোগিতা ছিল। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এবারের নির্বাচন যেন আনন্দ-উৎসবের দিক থেকে, শান্তি-শৃঙ্খলার দিক থেকে, ভোটার উপস্থিতির দিক থেকে, সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার দিক থেকে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আমরা তার প্রত্যাশার সঙ্গে একমত। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের নির্বাচনটি হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, যাতে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসহ সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। আমরা মনে করি, যেদিন ভোটাররা একদম নিশ্চিন্তে, নিজস্ব উদ্যোগে এবং বিনা বাধায় নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বুথ থেকে বের হতে পারবেন, সেই দিনই আমরা বলব ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এ কথা সত্য, একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সহযোগিতাও দায়িত্বের অংশ। কারণ ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে দরকার সবার ঐক্য।