× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

বিএনপি মহাসচিব যখন ‘বেদনায় নীল’

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:৪০ পিএম

বিএনপি মহাসচিব যখন ‘বেদনায় নীল’

অনুভূতির কোনো নির্দিষ্ট রঙ আছে কি নাÑ আমার অন্তত জানা নেই। তবে প্রচলিত কথায় মানুষের বিভিন্ন অনুভূতিকে বিভিন্ন রঙের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। যেমনÑ শোকের রঙ কালো, ভালোবাসার রঙ গোলাপি, বিপ্লবের রঙ লাল, তারুণ্যের রঙ ধরা হয় সবুজ আর বেদনার রঙ হিসেবে প্রতীক নীলকে। এসবই মানুষের সৃষ্টি। তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ রয়েছে। যেহেতু শোক মানুষকে মুহ্যমান করে দেয়, চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। তাই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে কালো ব্যাজ, কালো পতাকা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবেও কালো রঙ ব্যবহৃত হয়। সরকারের কোনো পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানাতে জনসাধারণ কালো পতাকা দেখিয়ে থাকে। আর আমাদের দেশের বড় দুটি দলের প্রবাসী সমর্থকরা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধানকে সে দেশের বিমানবন্দর কিংবা হোটেলের সামনে কালো পতাকা প্রদর্শনে ইতোমধ্যেই বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছে। অন্যদিকে প্রেমিক তার প্রেমিকার করকমলে অর্পণ করে লাল কিংবা গোলাপি রঙের গোলাপ। আর সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমে বিশ্বাসী দলগুলো ব্যবহার করে থাকে লাল পতাকা। 

আমাদের দেশের বামপন্থি সংগঠনের কর্মীরা আগে মিছিল মিটিংয়ে ‘লাল টুপি’ পরিধান করত। লাল কিন্তু আবার সতর্ক সংকেতও। সাধারণত কোনো বিক্ষোভ-সমাবেশ বা মিছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে পুলিশ গুলি চালানোর আগে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে বিক্ষোভকারীদের লাল পতাকা দেখিয়ে সতর্ক করার কথা। যদিও তা কোনো সময়ই মানা হয় না। বিশেষত, গত বছরের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় পতিত সরকারের পেটোয়া বাহিনী সে নিয়মের তোয়াক্কা করেনি। বিপদসংকেত প্রচারের জন্যও লাল ব্যবহৃত হয় সমুদ্রসৈকতে। সেখানে লাল পতাকা ওড়ানো মানে সাগরে ভাটার টান চলছে, তাই পানিতে নামা নিষেধ। কিন্তু নীলকে কেন বেদনার রঙ ধরা হয়, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। কেউ কেউ বলেন, মানুষ যদি বিষপানে আত্মহত্যা করে, কাউকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় কিংবা সাপের বিষে মারা যায়, তাহলে তার শরীর কিছুটা নীলচে হয়ে যায়। সেজন্য বেদনার প্রতীক হিসেবে নীলকে ব্যবহার করা হয়। তবে মানুষ কষ্ট পেলে তার মন যেভাবে কুঁকড়ে যায়, সেটাকে বোঝাতেই ‘বেদনায় নীল হওয়া’ বলা হয়ে থাকে। 

অতি সম্প্রতি একটি ঘটনার কথা শুনে ‘বেদনায় নীল’ হয়ে গেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চাঁদাবাজির দায়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পাঁচ সমন্বয়কের গ্রেপ্তারের খবর শোনার পর তার এ অনুভূতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গত ২৮ জুলাই রাজধানীর শাহবাগে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সমন্বয়কদের চাঁদাবাজির খবরে আমি বেদনায় নীল হয়ে গেছি। গণঅভ্যুত্থানের এক বছরেই এই অবস্থা! যে তরুণরা দেশ গঠন করবে, তারাই এখন চাঁদাবাজি করছে। আমরা কি এমন পরিণতি চেয়েছিলাম? এত তাড়াতাড়ি যদি এসব ঘটে, তবে ভবিষ্যৎ কী? হাসিনার পতনের পর এই তরুণদের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু দুঃখ হয়, জোরগলায় বলতে পারছি না যে, এদেশ নতুন করে গড়ে উঠবে। দেশে এমন অবস্থা তৈরি হচ্ছে, যাতে ফ্যাসিস্টদের নতুন করে সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।’ (প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ২৯ জুলাই, ২০২৫)।

চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে যারা জনসমর্থন অর্জন করেছিল, এক বছর না পেরোতেই তাদেরই একটি অংশের সেই একই অপকর্মে লিপ্ত হওয়া মানুষকে শুধু বিস্মিত নয়, আশাহতও করেছে নিঃসন্দেহে। বিশেষ করে, যারা একটি সুন্দর বাংলাদেশের প্রত্যাশায় নিজের সন্তানের হাত ধরে গত বছর জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছিলেন, তাদের হৃদয় মুচড়ে উঠেছে। আশা ভঙ্গের বেদনায় তারা ভারাক্রান্ত হয়েছেন। কিছুদিন ধরেই নবগঠিত রাজনৈতিক সংগঠন এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ পত্রপত্রিকায় উঠে আসছিল। কোথাও এরা জবরদস্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বা প্রিন্সিপালকে চেয়ার থেকে সরিয়ে দিয়েছে, কোথাও আবার সরকারি কর্মকর্তাদের নিজেদের হুকুম তামিল করতে বাধ্য করেছে। সেইসঙ্গে চাঁদাবাজির এন্তার অভিযোগ তো আছেই। প্রথমদিকে সেসব কথা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি। ভেবেছেন প্রতিপক্ষের অপপ্রচার। কিন্তু ক্রমেই বেরিয়ে আসতে থাকে থলের বিড়াল। অবশেষে আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক মহিলা এমপি শাম্মী আহমেদের বাড়িতে পঞ্চাশ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাঁচ সমন্বয়কের গ্রেপ্তারে সবাই বুঝতে সক্ষম হয়েছেন, অবক্ষয়ের যে ধারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না, জুলাই আন্দোলনের ফসলও। 

বেদনায় নীল শুধু মির্জা আলমগীর সাহেবই নন, দেশবাসী অনেকেই হয়েছেন। যেহেতু মির্জা সাহেব একজন সংস্কৃতিজন এবং নরম মনের মানুষ, তাই ঘটনাটি তাকে অতিশয় পীড়িত করে থাকবে। রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে সব অনাচার-অবিচার দূর করে সুশাসন কায়েমের জন্য পনেরোটি বছর তিনি ও তার সহকর্মীরা দানবীয় একটি সরকারের স্টিমরোলারে পিষ্ট হয়েছেন। সেই জগদ্দল পাথরকে জাতির বুক থেকে সরাতে যারা পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা, এক বছরের মাথায় তাদের এ স্খলন আশাবাদী যে কাউকে বেদনাক্রান্ত করবে সংগত কারণেই। বিশেষত যারা ভেবেছিলেন, জুলাই আন্দোলন ও আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে যে দেশপ্রেম, সততা ও দুর্নীতিবিরোধী চেতনা জাগ্রত করেছে, তাতে আগামী দিনে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ধরা দেবে। গড়ে উঠবে একটি দেশপ্রেমিক প্রজন্ম, যারা দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে আগুয়ান সৈনিকের ভূমিকা পালন করবে। তারা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে না, সমাজ থেকে সব ধরনের অবিচার-অনাচারের মূলোৎপাটন করে আক্ষরিক অর্থেই ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তুলবে। কিন্তু যতই দিন গত হচ্ছে, উদিত আশার সূর্যটা কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

হাসিনার পতন ও পলায়নের পর ক্ষমতাসীন হয়ে যখন অন্তর্বর্তী সরকার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা জাতিকে একটি ‘নতুন বাংলদেশ’র স্বপ্ন দেখালেন, কারও কারও মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কেমন হবে সে নতুন বাংলাদেশ! একই সঙ্গে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, এটা আবার এরশাদের ‘নতুন বাংলা’র মতো হবে না তো? চল্লিশোর্ধ্ব বয়সিদের স্মরণ থাকার কথা, বিএনপি সরকারকে রাতের অন্ধকারে বন্দুকের মুখে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করার পর সেনাপতি জেনারেল এরশাদ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ‘নতুন বাংলা’ গড়ে তুলবেন। তারপরের ইতিহাস সবারই জানা। এরশাদের নতুন বাংলার চেহারা কেমন ছিল, তা নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। দুর্নীতি, লুণ্ঠন, লাম্পট্য কোনোটাই বাদ রাখেননি পতিত সেই জেনারেল। ফলে অনেকেরই আশঙ্কা ছিল, বৈষম্যবিরোধীদের নতুন বাংলাদেশ না জানি কোন রূপে আবির্ভূত হয়। পুরোপুরি আবির্ভূত না হলেও যেটুক মাথা তারা দেখিয়েছে, তাতেই জনসাধারণের সব স্বপ্ন কর্পূরের মতো উবে যেতে বসেছে। 

দেশবাসী যেদিন প্রথম জানল সমন্বয়ক সারজিস আলম দেড় শতাধিক গাড়ির এক বিশাল বহর নিয়ে নিজের এলাকায় মহড়া দিয়েছেন, সেদিনই অনেকের চোখ কপালে উঠেছিল। ক’দিন আগের কপর্দকহীন শিক্ষার্থী অতগুলো গাড়ির ভাড়া কীভাবে মেটাল তার জবাব পাওয়া যায়নি আজ অবধি। তারপর একে একে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসতে থাকে সমন্বয়ক নামে সদ্য আবির্ভূত প্রজাতির সদস্যদের নানা কর্ম-অপকর্মের কাহিনী। কেউ তার এলাকায় কায়েম করেছেন সন্ত্রাসের রাজত্ব। কারও পিতাজি প্রবৃত্ত হয়েছেন পুত্রের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থোপাজনের ধান্দায়। এমনকি তাদের একজনের বিরুদ্ধে এক নারী সহকর্মী লাম্পট্যের অভিযোগ এনে সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদও করেছে। সুতরাং এরশাদের নতুন বাংলা আর সমন্বয়কদের নতুন বাংলাদেশের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকছে না। 

এটা অস্বীকার করা যাবে না, হাসিনার পতনের পর নতুন প্রজন্মের উত্থানে জাতির সামনে আশার আলো জ্বলেছিল। এখন সে আলো নির্বাপিত হতে বসেছে। আর তা হতে যাচ্ছে সে প্রদীপ যারা জ্বালিয়েছিল, তাদের কর্মকাণ্ডের কারণেই। ফলে এতে যদি কারও হৃদয় ভেঙে যায়, কেউ বেদনায় নীল হন, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি মহসচিব সমন্বয়কদের চাঁদাবাজি ও গ্রেপ্তারের খবরে বেদনায় নীল হয়েছেন। কিন্তু তিনি কি তার স্বগৃহের দিকে একবার তাকিয়ে দেখবেন? গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে তার দলের কর্মীরা বাঁধনহারা হয়ে যেসব বদনজির স্থাপন করে চলেছে, তাতে কি তিনি বেদনাহত হন না? সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের শত হুঁশিয়ারি এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরও তাদেরকে বাগে আনা যাচ্ছে না। পনেরো বছরে লীগ সৈনিকেরা যেসব অপকর্ম করেছে, এখন তা করছে মির্জা সাহেবদের কর্মীরা। এ বেদনার ভার সওয়া যে অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না!

  • সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা