মানসিক স্বাস্থ্য
শেলী সেনগুপ্তা, কলাম লেখক
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:৩৭ পিএম
শেলী সেনগুপ্তা
আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছে, যারা বিষণ্নতায় ভোগে এবং মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। প্রত্যেক মানুষের জন্য মানসিক চাপ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা পরিস্থিতি, যা অনুভূতিতে অসন্তোষ সৃষ্টি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মানসিক চাপের মুখে কোনো কোনো মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তিত্ব আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেও পারে। প্রত্যেক মানুষের জন্য এটি একটি কষ্টকর ঘটনা বা বিষয়।
মানসিক চাপকে আমরা জীবনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই বিবেচনা করতে পারি। যখন আমরা বলিÑ মানসিক চাপের মধ্যে আছি, তখন সাধারণত আমরা এটাই বোঝানোর চেষ্টা করি যে পরিবেশ বা পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী আমরা কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করছি বা বিশেষ কোনো পরিস্থিতির কারণে আমাদের মধ্যে উত্তেজনা এবং অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপের শিকার হতে পারি।
সাধারণত বড়দের ক্ষেত্রে আপনজনের মৃত্যু, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, প্রত্যশার অপূর্ণতা এবং শিশুদের ক্ষেত্রে পড়াশোনার চাপ, অতিরিক্ত শাসন, হঠাৎ বন্ধু বিচ্ছেদ কিংবা বাবা মা’র বিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণে মানসিক চাপের সৃষ্টি হতে পারে। এই চাপ থেকে মুক্ত হতে হবে, মন ভালো রাখতে হবে। কারণ মন ভাল না থাকলে আবেগ , আচরণ ও চিন্তার সমস্যা হয়। প্রকৃত কথা হলো, যে বিষয়ের ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না সে বিষয়ে চিন্তা করারও দরকার নেই। আবার এ কথাও ঠিক যে সমস্যা এড়িয়ে না গিয়ে এর মুখোমুখি হতে হবে। অনেক সময় সঠিক সময়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারার কারণে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়, মনে রাখতে হবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া, যেকোনো বয়সেই হতে পারে। এজন্য ধৈর্য রাখতে হবে।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্বাস্থ্য। এই স্বাস্থ্য আবার দুই প্রকার। শারীরিক স্বাস্থ্য আর মানসিক স্বাস্থ্য। আমরা প্রায়ই শারীরিক স্বাস্থ্যের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে থাকি। শারীরিক অসুস্থতার জন্য আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, কিন্তু মানসিক অসুস্থতার জন্য আমরা তা করি না, বরং বিষয়টিকে অন্যদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখি। আমরা ভুলে যাই মানসিক স্বাস্থ্যেরও যত্ন নিতে হয়। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলে প্রতিদিনের কাজকর্ম ভালোভাবে সম্পাদন করা সম্ভব। একই সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য প্রথমেই আমাদের যা করতে হবে তা হলো, সময়ের সঠিক ব্যবহার। অনেক কাজের মধ্যে গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ কাজটি আগে করতে হবে। তেমনি জটিল কাজটি করতে হবে সবার আগে। দ্বিতীয়টি হলো যেকোনো পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার মতো সচেতনতাও থাকতে হবে। বুঝতে হবে পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল, সে পরিবর্তনকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে, তাহলে মানসিক চাপ অনেকাংশেই কমে যাবে।
মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য মাঝে মাঝে শরীরের পেশিগুলোকে শিথিল করে দিতে হয়। তাতে শরীরে অক্সিজেনের ভারসাম্য সঠিক থাকে, ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। পেশি শিথিল করার জন্য গভীরভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করতে হয়, তাতে মন শান্ত হয়, মানসিক চাপ কমে যায়। এজন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা যায়। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীর ও মন ভালো থাকে, শারীরিক অসুস্থতা থেকে মুক্ত থাকা যায়, শরীরে সুখী হরমোন নিঃসরণ ঘটে। এর ফলে ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। শরীর ভালো থাকে, কাজে মন বসে।
মন ভালো রাখার জন্য অনেকেই মাদকের আশ্রয় নেয়, এটি কখনোই করা উচিত নয়। আমাদের চারপাশে কেউ যদি মাদকের আশ্রয় নেয় তাকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে তার মনের কথা শুনতে হবে। সহানুভূতি দিয়ে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বের করে আনতে হবে। সামাজিক সেবামূলক কাজ মনের চাপ কমায় ও আনন্দে রাখে।
আমরা সবাই-ই ব্যস্ত। তবুও ব্যস্ততম যান্ত্রিক জীবন থেকে অন্তত কিছু সময়ের জন্য বিরতি নেওয়া যায়, এতে কাজের প্রতি মমতা বৃদ্ধি পায়। কাজে দক্ষতা আসে। প্রতিটি কাজের মধ্যে বিরতি নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কারও সঙ্গে হালকা গল্প করা যায়, দু-এক কদম হেঁটে আসা যায় কিংবা গান শোনা যায়।
সব সময় নিজেকে ইতিবাচক রাখতে হয়। কারণ ইতিবাচক চিন্তা মানুষকে সুখী করে এবং জীবনের সকল প্রতিকূলতাকে জয় করার শক্তি জোগায়। নেতিবাচক চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলে মনে হতাশার জন্ম হয়।
কখনও কখনও কিংবা দিনের কিছু সময় নিজেকে প্রযুক্তি থেকে মুক্ত করে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে সময় কাটাতে হবে। প্রিয় মানুষের কথা শুনতে হবে এবং নিজের কথাও বলতে হবে। আজকাল মানুষের মধ্যে শেয়ার করার মানসিকতা কমে গেছে। আপনজনের সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নিতে হবে। সুন্দর পারিবারিক আবহ মানুষকে সুখী করে, সে সুখটুকু গ্রহণ করার মানসিকতাও থাকতে হবে।
মাঝে মাঝে প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে হয়। মানুষ প্রকৃতির অংশ, তাই প্রকৃতি থেকে নতুন করে জেগে ওঠার শক্তি সংগ্রহ করতে হয়। তাতে মন শান্ত হয় এবং কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
মনে রাখতে হবেÑ আমাদের জীবন একটি যাত্রাপথ। এ যাত্রাপথে অনেক চ্যালেঞ্জ আসে, সেগুলো মোকাবিলা করেই সামনে এগিয়ে যেতে হয়। সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য অনেক সময় অন্যের সহযোগিতা নিতে হয়। মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে মনোচিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যায়।
মানসিক চাপের কারণে কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো কঠিন পথটিও বেঁচে নিতে প্রস্তুত হয়। এটি কখনোই হওয়া বা করা উচিত নয়। বুঝতে হবে, বেঁচে থাকাটা আনন্দের বিষয়, মনের যত্নে আনন্দে বাঁচতে হয়। জীবনকে সর্বোচ্চ উপভোগ করতে হয়।
ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার উন্নতি করা অর্থাৎ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ শক্তি বিকাশের মধ্য দিয়ে মানসিক চাপের বাধা দূর করা ও আত্মনির্ভরতা বাড়ানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো বর্তমান। বর্তমানকে নিয়েই ভাবতে হবে।
নিজের জগৎকে বা চারপাশকে সুন্দর করে সাজিয়ে নিজের মনের হতাশাগুলোকে দূর করা যায়। সময়ের অপচয় রোধ ও সম্ভাব্য মানসিক চাপ কমানো যায়।
মনে রাখতে হবে, ‘বিশ্রাম কাজের অঙ্গ একসাথে গাঁথা, নয়নের অংশ যেমন নয়নের পাতা’। তাই বলতে পারি মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। এতে শারীরিক বিশ্রামের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক বিশ্রামও হয়ে যায়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যেতে হবে এবং একই সময়ে ঘুম থেকে জাগতে হবে, একসময় এটি অভ্যাসে পরিণত হবে। ঘুম আসতে না চাইলেও নির্দিষ্ট সময় বিছানায় যেতে হবে। মনে রাখতে হবে স্বল্প কিংবা অতিরিক্ত ঘুম দুটোই স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। পর্যাপ্ত ঘুমের ফলে দেহের ও মনের শূন্যতা পূরণ হয়ে যায়। রোগপ্রতিরোধ শক্তি অটুট থাকে এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
পুষ্টিকর খাবার শরীর সুস্থ রাখে, মন ভালো রাখে। প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হয়। জীবনের প্রতিকূল বা বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা একান্ত জরুরি। তবেই সব সময় সকল প্রতিকূল পরিবেশে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে বলতে পারি, নিজে ভালো থাকা এবং অন্যকে ভালো রাখার আনন্দই জীবনকে সফল ও অর্থবহ করে তুলতে পারে।