রুগ্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১০:১৩ এএম
আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিজেই রুগ্ণ। স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলোও বহুল আলোচিত। বিশেষ করে আইনি কাঠামোর অভাব, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, চিকিৎসালয়ের সক্ষমতার ঘাটতি, ঔষধনীতির সীমাবদ্ধতাসহ রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। রয়েছে কর্তৃপক্ষীয় উদাসীনতাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রও। অথচ মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম অধ্যায় হলো দেশের স্বাস্থ্য খাত। প্রতিবছর এই খাতের উন্নয়নে বিশাল অঙ্কের বরাদ্দও রাখা হয়। কিন্তু এই বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়েছে তার দৃষ্টান্ত খুবই কম। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের একটি সুষ্ঠু ও গুণগত কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণে ‘কমিশন’ গঠন করেন। কমিশন দেশের সব নাগরিকের জন্য ‘স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিতে আইন সংস্কারসহ নতুন আইন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ভুগতে থাকা দেশের স্বাস্থ্য খাতে গুণগত পরিবর্তন আনতে এবং স্বাস্থ্যসেবাকে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে সরকার। এমন বাস্তবতায় দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের স্টেন্টের (রিং) দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানিয়েছে। সিদ্ধান্তটি সঠিক, অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জন স্বস্তির বিষয়ও বটে।
৫ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘হার্টের রিংয়ের দাম কমল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, সরকার তিন কোম্পানির ১১ ধরনের স্টেন্টের দাম কমিয়ে নতুন করে নির্ধারণ করেছে। স্টেন্ট আমদানি প্রতিষ্ঠান স্টেন্টভেদে খুচরা মূল্য সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দাম কমবে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। জানা যায়, বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটির সুপারিশ, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের যুক্তিসংগত মুনাফা এবং ভ্যাট-শুল্ক ইত্যাদি বিবেচনায় তিনটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি অ্যাবট, বোস্টন সায়েন্টিফিক এবং মেডট্রনিকের আমদানি করা স্টেন্টগুলোর দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এ কথা সত্য যে, হার্ট বা হৃদরোগের চিকিৎসা সাধারণত ব্যয়বহুল। এই খরচ বিভিন্ন কারণের ওপর নির্ভর করে, যেমনÑ চিকিৎসার ধরন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, ডাক্তারের ফি এবং ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও ওষুধপত্রের খরচ। বিশেষ করে অস্ত্রোপচার, রিং পরানো বা অন্যান্য পদ্ধতির জন্য অনেক বেশি খরচ হয়ে থাকে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও হৃদরোগের মৃত্যুর সংখ্যা ও ঝুঁকি বেশি। অনেক সময় হৃদরোগে আক্রান্তের পর রোগীকে হাসপাতালে আনার পথেই তার মৃত্যু ঘটে। জনস্বাস্থ্য ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় হৃদরোগে, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ লোক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে এই সংখ্যাটা ৩ লাখের ওপরে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৩৪ শতাংশই ঘটে হৃদরোগে। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৪০ শতাংশেরও বেশি হয় অকালমৃত্যু। ডব্লিউএইচও’র গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন ২০২৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর দুই লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করে। যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। অবাক করা বিষয়Ñ এর অর্ধেকই জানেন না, তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। এই ধরনের মৃত্যু রোধে কার্যকর উপায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর এর চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশে অনেক রোগীর জন্যই এই চিকিৎসা ব্যয় বহন কষ্টসাধ্য। তবে নিয়মিত চেকআপের মধ্যে থাকলে ও সুস্থ জীবনযাপন করলে হৃদরোগের আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যায়। অর্থাৎ বলা হচ্ছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।
বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে, এটা স্বীকার করাই যায়। দেশের সব মেডিকেল কলেজেই হৃদরোগ বিভাগ রয়েছে এবং চিকিৎসকও পর্যাপ্ত। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েও উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায়। তবে জেলা পর্যায়ে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ থাকলেও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে এনজিওগ্রামের ব্যবস্থা এখনও হয়ে ওঠেনি। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের কার্ডিওলোজি বিভাগ হৃদরোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য সুপরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এনজিওগ্রাম, রিং পরানো, ভালভ প্রতিস্থাপন ইত্যাদি সহজলভ্য। পরিসংখ্যান বলছে, একসময় এনজিওগ্রাম পরীক্ষার জন্য বিদেশ-নির্ভরতা ছিল। বর্তমানে ১০ শতাংশের কম রোগী হৃদরোগের চিকিৎসায় দেশের বাইরে যায়, বাকি ৯০ শতাংশ দেশেই চিকিৎসা নেয়। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার সবটাই ঢাকাকেন্দ্রিক। ৯৫ শতাংশ হার্ট সার্জারি ঢাকার হাসপাতালগুলো করে থাকে। যেখানে দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের বাস। আর ৯০ ভাগ মানুষের জন্য মাত্র পাঁচ ভাগ সার্জারি করা হয়। আরও বিস্ময়কর দেশের ৮০ ভাগ রোগীর ভরসা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট। এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি।
আমাদের দেশের চিকিৎসার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট বরাবরের। আন্তর্জাতিক মানের ভালো চিকিৎসক থাকলেও বিভিন্ন কারণে বেশিরভাগ সচ্ছল রোগী দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। অবশ্য আস্থা হারানোর পেছনের অসংখ্য কারণ রয়েছে। রয়েছে ভুল চিকিৎসা, ভুয়া চিকিৎসক, রোগীর প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ না দেওয়া, রোগীর কাছ থেকে অনৈতিক অর্থ আদায়, বেসরকারি হাসপাতালে খরচের বাড়াবাড়ি, নকল ওষুধÑ এমন বহু অভিযোগ। আসলে স্বাস্থ্যসেবায় এ ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা আমাদেরকে ব্যথিত করে। অথচ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা খাতে সাধারণ মানুষের আস্থার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘটেছে এর উল্টো। আমাদের প্রত্যাশা, এসবের সমাধান শিগগিরই হবে। দেশের চিকিৎসার প্রতি মানুষের পুরোপুরি আস্থা ফিরে আসবে। আমাদের বিশ্বাস, দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে যেসব সমস্যা বিরাজ করছে সেগুলোর সমাধানে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের স্টেন্টের (রিং) দাম কমানোর সিদ্ধান্তে আমরা আনন্দিত, সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। সব ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে, সেটাই প্রত্যাশা।