× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান

শহীদ ও সংগ্রামীদের স্বপ্নপূরণ করতে হবে

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১৪:০৬ পিএম

শহীদ ও সংগ্রামীদের স্বপ্নপূরণ করতে হবে

মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে ফ্যাসিস্ট রেজিম চিরতরে মুছে দিতে রাত-দিন রাজপথে ছিল দেশের ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষ। টানা ৩৬ দিনের এই লড়াইয়ে সবাই মাঠে নেমেছিল দীর্ঘদিন জাতির ঘাড়ে বসে থাকা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটাতে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল দেশবাসী। বিশেষ করে সরকারি দল ও আমলাদের দুর্নীতির মহোৎসব এবং চাকরিসহ সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র তরুণসমাজকে বিষিয়ে তুলেছিল। সেই অবস্থান থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমে ছাত্রসমাজ পরে আপামর-জনতা রাজপথে নেমে আসে। সবার সন্মিলিত অংশগ্রহণ রূপ পায় গণঅভ্যুত্থানে। আওয়ামী সন্ত্রাসী, বেপরোয়া র‌্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর তাক করা অস্ত্র-গুলির সামনে ‘ঢাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সবাই। আর এভাবেই আওয়ামী লীগের নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় সূচিত হয়। হারাতে হয় দম্ভ ও ক্ষমতা। দিনটি ছিল ৫ আগস্ট ২০২৪, সোমবার। ঠিক এক বছর আগের জ্বলন্ত ইতিহাস এটি। সেইদিন বহু দুঃখ, যন্ত্রণা ও স্বজন হারানোর ক্ষত থাকার পরও মানুষ রচনা করেছে ‘বিজয়গাথা’র এক ইতিহাস।

আজ এই মহান দিনে ‘৩৬ জুলাই’-এর সকল শহীদকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি জানাচ্ছি। দলমত নির্বিশেষে যারা অংশ নিয়ে বিজয় এনেছেন তাদের প্রতি অভিনন্দন। ধন্যবাদ সশস্ত্রবাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যদেরকে। তারা একপর্যায়ে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে জনতার কাতারে শামিল হন। ফলে দুঃশাসনের পতন ও পলায়ন ত্বরান্বিত হয়। এটা এই বাহিনীর ঐতিহ্য। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাংলাভাষী সৈনিকরা বিদ্রোহ করে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন। এই যুদ্ধই মুক্তিযুদ্ধে উন্নীত হয়।

১৫ বছর শেখ হাসিনার অতি স্বৈরতান্ত্রিকতার কারণে রাষ্ট্র, সরকার ও ক্ষমতাসীন দল একীভূত হয়ে গিয়েছিল। তাদের দম্ভ এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, নির্বিচারে যখন যা ইচ্ছা তাই করে গেছে। তাদের ফ্যাসিস্ট রেজিম হত্যাযজ্ঞ, গুম, অপহরণ, নিপীড়ন, অবিচার, লুণ্ঠনের এক নারকীয় অধ্যায় রচনা করে। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে। ব্যাপক দলীয়করণে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলীয় স্বার্থের দাস বানায়। পেশাজীবীদের লোভ-টোপ-ভীতি ছড়িয়ে ক্রীতদাসে পরিণত করে। বড় বড় ব্যবসায়ীদের লুটপাটের সুযোগ দিয়ে অলিগার্ক বানানো হয়। সাংবাদিকতা হয়ে যায় বশংবদ ভৃত্য। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন তেলচর্চার সার্কাস হয়ে দাঁড়ায়। ‘প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি’ কালচার চালু হয়। বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না। সাজানো বিরোধী দল থেকে মন্ত্রীও বানানো হয়। জবাবদিহিতার কোনো অবকাশ রাখা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উন্নয়নের নামে করা হয় সব অপকর্ম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল। উন্নয়নের নামে লুটপাট শুরু হয়। বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়। কানাডা, মালয়েশিয়ায় বেগমপাড়া গড়ে ওঠে দুর্নীতিবাজদের। লন্ডন, আমেরিকা, দুবাইতে শত শত বাড়ির মালিক হয় অনেকে এবং সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে তারা।

নিষ্ঠুর নির্যাতনে সব বিরোধী মত স্তব্ধ করা হয়। এভাবেই তারা তাদের দুঃশাসন প্রলম্বিত করে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি তারা। হিটলার, মুসোলিনি এবং সাম্প্রতিক কালে সাদ্দাম, গাদ্দাফিদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেয়নি। আইউব ও এরশাদের পতনের ইতিহাস থেকেও কিছুই শেখেনি তারা। তাই তাদের আরও করুণ পতন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ কর্তা, আমলা এমনকি তাদের নিয়োজিত জাতীয় মসজিদের ইমামকে পর্যন্ত পালিয়ে যেতে হয়েছে। সেদিনের বাস্তবতায় প্রমাণ হয়েছে, জনগণের শক্তির কাছে কোনো ফ্যাসিবাদই চিরস্থায়ী হতে পারে না। এই অভ্যুত্থানে আরও একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত হলোÑ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো স্বৈরশাসকই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না। 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ৬/৭ জন মানুষকে জীবন দিতে হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ৬১ জন মারা গিয়েছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শত শত মানুষকে পশুর মতো গুলি করে হত্যা করেছে। শিশু, নারী-পুরুষ, শিক্ষক, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, খুদে ব্যবসায়ী, দোকানি কে নেই মৃত্যুর তালিকায়? মৃত্যুর মিছিলও আন্দোলনকারীদের মনে ভয় ধরাতে পারেনি। কারণ, স্বৈরশাসনের স্পর্ধা প্রতিটি মানুষের হৃদয়তন্ত্রে আঘাত করেছিল।

একটি ঐতিহ্যবাহী সংগ্রামী দল, যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে তারা রাজনীতিকে কলুষিত, বিকৃত ও বিলুপ্ত করে ফেলে। ত্যাগী ও আদর্শবাদীদের কোণঠাসা করে দলে হাইব্রিড, লুটেরা, সন্ত্রাসী, সুবিধাবাদীদের কব্জায় চলে যায়। বিশেষ করে শেখ হাসিনা নিজেকে দল ও দেশের ঊর্ধ্বে ভাবতেন। সে কারণে ১৫ বছরের শাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে একক কর্তৃত্ব দেখিয়েছেন। পালিয়ে যাওয়ার আগের দিনও আন্দোলন দমাতে দলের লোকজনকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহিংসতা ঘটাতে নির্দেশনা দিয়েছেন, যা কলঙ্কজনক ও ইতিহাসে নজিরবিহীন। এভাবে রাজনৈতিক দলের চরিত্র হারিয়ে তারা সন্ত্রাস, লুণ্ঠিত অর্থসম্পদ, পেশিশক্তি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর ওপর ভর করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। জনগণকে তারা পরোয়া করেনি এবং তাদের শক্তিকে রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে সব সময় দমিয়ে রাখা সম্ভব ভেবেছিল। ওই ভুলের মাসুল তাদেরকে দিতে হয়েছে বিপর্যয়কর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।

মানুষ জীবন দিয়েছে অকাতরে। সাহসী লড়াই করেছে। এই বিজয়ের রক্তরঞ্জিত ইতিহাসে মিশে আছে আমাদের শিশুদেরও রক্ত। এত ত্যাগের এ বিজয়কে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। শহীদ ও সংগ্রামীদের আশা ও স্বপ্নপূরণ করতে হবে। অপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে সভ্যতার দাবি পূরণ করতে হবে। জাতীয় ঐক্য গঠন করতে হবে সব দ্বন্দ্ব ও বিরোধের নিষ্পত্তির মাধ্যমে। সবাই মিলে এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে, এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে মানুষ, তার চাহিদা, অধিকার ও মর্যাদা প্রাধান্য পাবে। স্বৈরশাসন আর কখনও ফিরে আসবে না। মানবতার জয় হবে। সমৃদ্ধির পথে আমরা এগোতে পারব। তবেই অভ্যুত্থান ও জীবনদান সার্থক হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা